নতুন বিপদ ‘ডেল্টা প্লাস’
এখনো রূপ বদলাচ্ছে করোনা ভাইরাস। এক ঢেউ সামাল দেয়ার আগে হানা দিচ্ছে আরেক ঢেউ। বিপর্যস্ত করে তুলছে উন্নত দেশগুলোকেও। সর্বশেষ ‘ডেল্টা প্লাস’ নামে করোনার নতুন এক ধরনের সংক্রমণের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের গবেষকরা। তারা বলছেন, নতুন এই ধরনের দ্রুত ছড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে। তবে দ্রুত ছড়ালেও বর্তমান টিকা এই ভ্যারিয়েন্টেও কার্যকর।
যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের সামনেও নতুন বিপদ হতে পারে ‘ডেল্টা প্লাস’ ভ্যারিয়েন্ট- এমনটাই মনে করছেন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যুক্তরাজ্যসহ আমাদের আশপাশের দেশগুলোতে ‘ডেল্টা প্লাস’ ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। ধরনটি আমাদের দেশের জন্যও বিপদজনক হতে পারে। দেশে করোনার সংক্রমণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। তবে আবার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। এজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দ্রুত সবাইকে টিকার আওতায় আনতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের দেশের নিয়মিত যাতায়াত চালু রয়েছে। সেখান থেকে মানুষ আসছে, আমাদের দেশ থেকে মানুষ যাচ্ছে। তাই সংক্রমণটি আমাদের দেশে ছড়ানোর শঙ্কা রয়েছে। সেজন্য সতর্কতামূলক সব ব্যবস্থা নিলে হবে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘আমাদের দেশে যখন ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের মহামারী চলছিল তখন ভারতে ডেল্টা প্লাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল। তবে আমাদের দেশে তা ছড়ায়নি। তবে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে। সংক্রমণ আবার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি টিকার আওতায় সবাইকে নিয়ে আসতে হবে।’
হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘দেশে এখনো ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে আমাদের আশপাশের দেশে তা দ্রুত ছড়াচ্ছে। এমনিতে করোনার সংক্রমণ আমাদের দেশে স্বস্তিজনক অবস্থায় রয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার দেড় শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু আমাদের সতর্কতায় ঢিলে দেয়ার ন্যূনতম কোনো অবকাশ নেই। যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, জার্মানি, পোলেন্ড, ইউক্রাইন এসব যায়গায় কিন্তু সংক্রমণ ফের বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে লকডাউন দেয়ার জন্য সুপারিশ বাড়ছে। সবমিলিয়ে যেহেতু বিশ্বে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ এখনো নির্মূল হয়নি। আমাদের আশ-পাশের দেশে ডেল্টা প্লাসের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে তাই আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।’
বিবিসি জানায়, ডেল্টা প্লাস কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা (হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি ইউকেএইচএসএ)। আবার ডেল্টা প্লাসে সংক্রমিত হলে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কিনা তারও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যে এ পর্যন্ত করোনার ডেল্টা ধরনেই বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ডেল্টা প্লাস ধরনের সংক্রমণও বাড়ছে সেখানে। যুক্তরাজ্য সরকারের সা¤প্রতিক এক জরিপ বলছে, ডেল্টা প্লাসে সংক্রমণের হার ৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাস সাধারণত সব সময়ই পরিবর্তিত হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিবর্তিত হয়ে দুর্বল হয়ে যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তিত ভাইরাস পুরোনো ভাইরাসের চেয়ে শক্তিশালী ও বেশি সংক্রামক হয়ে দেখা দেয়। পরিবর্তিত রূপটি অন্য ভ্যারিয়েন্টগুলোর তুলনায় মারাত্মক অসুস্থতা তৈরি করে।
ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্টটিতে ‘কে৪১৭এন’ নামে একটি অতিরিক্ত মিউটেশন রয়েছে, যেটি দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে শনাক্ত হওয়া বেটা ও গামা ভ্যারিয়েন্টেও পাওয়া গেছে। নতুন এই ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্টকে এখনই ‘উদ্বেগের’ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।
তারা বলছেন, দুর্বল ইমিউনিটির মানুষ বা মহামারী শুরুর দিকে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের আবারো আক্রান্ত করার ক্ষেত্রে ডেল্টা প্লাস হয়তো ডেল্টার চেয়ে কিছুটা বেশি কার্যকর হবে। অনেক বিশেষজ্ঞই ডেল্টা প্লাস ভ্যারিয়েন্টকে হালকাভাবে নেয়ার পক্ষপাতী নন।
হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সির (ইউকেএইচএসএ) প্রধান নির্বাহী ড. জেনি হ্যারিস বলেন, ভ্যাকসিনের কোনো বিকল্প নেই। যারা উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন তাদের দ্রুত বুস্টার ডোজ নিতে হবে।
পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে জোর দিয়ে তিনি বলেন, ভিড়যুক্ত এলাকায় মাস্ক পরুন, বাহির থেকে আসা লোকদের সাথে দেখা করার সময় বাড়ির জানালা খুলে দিন, সার্বিক সাবধানতা অবলম্বন করুন। যদি কোভিড উপসর্গ থাকে তবে একটি পিসিআর পরীক্ষা করুন এবং রেজাল্ট না পাওয়া পর্যন্ত বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকুন।
খবর সারাবেলা / ২৪ অক্টোবর ২০২১ / এমএম




