দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুমিছিল

April 19, 2020

করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে করুণ অবস্থা। প্রতিদিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। ফলে করোনার পাবলিক ট্রান্সমিশন বা গণসংক্রমণ রোধ করার লক্ষ্যে দেশের মানুষকে ঘরে রাখতে কঠোর অবস্থানে গিয়েছে সরকার।

বিভিন্ন এলাকাকে লকডাউনের পাশাপশি অঘোষিতভাবে লকডাউন করা হয়েছে পুরো দেশকে। পাশাপাশি করোনার উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিবেচনা করে গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতর সমগ্র বাংলাদেশকে সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

যার মূলে রয়েছে মানুষে মানুষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। মানুষকে ঘরে রাখতে রাজপথের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় টহল দিচ্ছে সশস্ত্র বাহিনী, র‌্যও পুলিশ। অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা করায় মানুষকে বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানাও করা হচ্ছে। এত কিছুর পরও ঘরে রাখা যাচ্ছে না দেশের লোকজনকে।

বরং প্রতিদিন হাট-বাজারে মানুষের জটলা বাড়ছেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘর থেকে বের হাচ্ছেন তারা। কারণে-অকারণে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, বাজারে যাচ্ছেন। মানছেন না প্রশাসনের নির্দেশনা। সামাজিক দূরত্বও থাকছে না। রাজধানীর পাড়া-গলি থেকে শুরু করে দেশের গ্রামগঞ্জ সব জায়গায়ই একই অবস্থা। খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরও বলছে মানুষ তাদের পরামর্শ শতভাগ মানছে না।

তবে রাজধানীতের এক শ্রেণির মানুষের দাবি তারা নিতান্তই পেটের তাগিদে বের হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। ভাড়ায় চলছে দু’-একটি রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশাও। ঘরে খাবার না থাকার কারণে তারা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া সারাদেশেই ন্যায্যমূল্যে টিসিবির পণ্য কিনতে আসা মানুষও সামাজিক দূরত্ব মানছে না।

ট্রাকের সামনে ভিড় ধাক্কাধাক্কি করে মানুষ এসব পণ্য কিনছে। গ্রামা লে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা চলছে। ত্রাণ পেতে মানুষ কোনো নিয়ম মানছে না। এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন উপস্থিত থাকলে কিছুটা সামাজিক দূরত্ব রক্ষা পেলেও অন্য সময় তা একেবারে মানা হচ্ছে না।

প্রয়োজনীয় কেনাকাটার বাইরেও মানুষ চায়ের দোকানে এখনো আড্ডা অব্যাহত রেখেছে। প্রধান শহরগুলোর পাশাপাশি প্রত্যন্ত অ লের পাড়া-মহল্লার গলিতেও অহেতুক বের হচ্ছে মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাইকিং, টহল, জরিমানাÑ কোনো কিছুতেই গা করছে না কেউ। এমনকি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা ও এলাকায় লকডাউন উপেক্ষা করে এখনো মানুষ বের হচ্ছে। বিশেষ করে এখনো লোকজনের স্থানান্তর অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষ করে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করছে গার্মেন্টস শ্রমিকরা। হাজার হাজার শ্রমিকদের করোনা সংক্রমণের সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব না মেনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অবস্থান করায় বাড়ছে করোনার ঝুঁকি।

বেশ কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, যারা ঘর থেকে বের হচ্ছেন তাদের জিজ্ঞেস করলেই, অজুহাতের শেষ নেই। এই কাজ, সেই কাজ। আসলে নেই কোনো কাজ। শুধুমাত্র আড্ডা দিতে বের হচ্ছেন অনেকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এখনো মানুষ আমাদের পরামর্শ মেনে চলছে না। আমাদের পরামর্শ বাড়িতে থাকুন, ঘরে থাকুন, নিজে সুস্থ থাকুন, পরিবারকে সুস্থ রাখুন। বার বার সাবান পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড করে হাত ধুয়ে ফেলুন, পরিবারের সবাইকে হাত ধোয়ার জন্য উৎসাহিত করুন। একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে কমপক্ষে ৩ ফুট শারীরিক দূরুত্ব বজায় রাখুন। সর্দি-কাশি হলে বা জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যেতে হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন। ঘরে তৈরি তিন স্তর বিশিষ্ট কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অনেকেই আমাদের এ নির্দেশনা মানছেন না।

করোনায় মৃত বেড়ে ৮৪, আরো আক্রান্ত ৩০৬: মহামারী করোনা ভাইরাসে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৯ জন মারা গেছেন। ফলে ভাইরাসটিতে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৮৪ জনের। করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরো ৩০৬ জন। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল দুই হাজার ১৪৪ জনে।

গতকাল শনিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। অনলাইনে বুলেটিন উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, এমআইএস পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান খান। এতে নিজের বাসা থেকে সংযুক্ত হয়ে কথা বলেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

ডা. ফ্লোরা জানান, করোনা ভাইরাস শনাক্তে গত ২৪ ঘণ্টায় দুই হাজার ২৪৪টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নতুন করে যুক্ত হওয়া যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৯টি ল্যাবরেটরিতে মোট দুই হাজার ১৯০টি নমুনার পরীক্ষা হয়। এতে আরো ৩০৬ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। ফলে দেশে মোট করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে দুই হাজার ১৪৪। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মারা গেছেন আরো নয়জন। এতে মৃতের সংখ্যা হয়েছে ৮৪। এছাড়া সুস্থ হয়েছেন আরো আটজন। ফলে মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬ জনে।

বুলেটিনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৬৬ জনকে আইসোলেশনে নেয়া হয়। আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়েছেন ৩২ জন। হোম কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে আরো তিন হাজার ৬৪১ জনকে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে ১৭৪ জনকে। সবমিলিয়ে তিন হাজার ৮১৫ জনকে কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়। আর এই সময়ে কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড় পান চার হাজার ২৬ জন। বুলেটিন উপস্থাপনকালে করোনার বিস্তার রোধে সবাইকে বাড়িতে থাকার এবং স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়।

জেদ্দায় করোনায় আক্রান্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর: সৌদি আরবে এবার করোনায় আক্রান্ত হলেন বাংলাদেশ জেদ্দা কনস্যুলেটে কর্মরত লেবার কাউন্সিলর আমিনুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে জেদ্দার একটি হাসপাতালের আইসোলেশনে আছেন বলে রিয়াদ দূতাবাসের প্রেস উইং জানিয়েছে।

তবে এই প্রথম বিদেশি মিশনে কর্মরত কোনো কর্মকর্তার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেল। কাউন্সিলর (লেবার) মো. আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ মিশন, জেদ্দায় দায়িত্ব পালন করছিলেন ২ বছর ৮ মাস ধরে। তবে জেদ্দা এবং এর আশপাশ প্রদেশের নিয়মিত করোনা আপডেট দিতেন তিনি।

জানা গেছে, তিনি গত সপ্তাহে মদিনা ভিজিট করেন। মদিনার বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রায় ৪ হাজার প্রবাসী যারা আতঙ্কে করোনা পরীক্ষায় রাজি হচ্ছিলেন না, তাদের রাজি করাতে এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে বোঝাতে সৌদি প্রশাসনের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ধারণা করা হচ্ছে, লেবার কাউন্সিলর আমিনুল ইসলামের শরীরে করোনা ভাইরাস মদিনা থেকে সংক্রমিত হয়।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

দেড় লাখ ছাড়াল করোনায় মৃতের সংখ্যা: সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্য দেড় লাখ ছাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২২ লাখ ছাড়িয়ে গেল। গত বছর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে চীনের উহানে প্রথম শনাক্তের পর এখনো পর্যন্ত বিশ্বের ২১০টি দেশ এবং অ লে ছড়িয়েছে প্রাণঘাতী এই করোনা ভাইরাস।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা নিয়ে প্রতি মুহূর্তের আপডেট জানানো ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারে গতকাল শনিবার সকাল ১০টার দিকেই দেখা গেল আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এ রিপোর্ট লেখার সময় মোট মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৫৪ হাজার ২৬৬ জন।

১১ এপ্রিল করোনায় মৃতের সংখ্যা পার হয় ১ লাখ। ওই সময় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৫০ হাজার ছুঁই ছুঁই। এরপর জ্যামিতিক হারেই বাড়তে তাকে মৃত এবং আক্রান্তের সংখ্যা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় লাখে এবং আক্রান্ত বেড়ে ২২ লাখ ২৮ হাজার ৭৮৪। আক্রান্তদের মধ্যে অবশ্য ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৭৮১ জন সুস্থও হয়েছেন।

প্রথম দিকে চীন থেকে ইরান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়ায় ছড়ায় এই ভাইরাসটি। মার্চের শুরুর দিকেই ইতালিতে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাসটি। এরপর পর্যায়ক্রমে ইউরোপের বাকি দেশগুলো স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এর উপস্থিতি বাড়তে থাকে আটলান্টিকের ওপারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

এখনো পর্যন্ত করোনায় সবচেয়ে বিধ্বস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র। পৃথিবীর শক্তিধর এই দেশটিতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ (৬ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪১ জন)। মৃত্যু ৩৫ হাজার ৫০০ জনের। গতকাল একদিনেই যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু হয়েছে সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষের। মৃতের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইতালি। দেশটিতে আক্রান্ত ১ লাখ ৭২ হাজার ৪৩৪ জন। মৃত্যু হয়েছে ২২ হাজার ৭৪৫ জনের।

খবর সারাবেলা / ১৯ এপ্রিল ২০২০ / এমএম