করোনার হঠাৎ আগ্রাসী রূপ

দেশে করোনা সূচকের ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা গত ১০ দিন ধরেই চলমান। প্রতিদিনই গাণিতিক হারে বাড়ছে সংক্রমণের হার। এর মাঝে মঙ্গলবার এক দিনেই মৃত্যুর সংখ্যা হঠাৎ লাফিয়ে বিগত দিনগুলোর তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

মারা গেছে ৩৯ জন। যা বিগত ৫৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। গতকালের সংক্রমণের সংখ্যাও ছিল বিগত ৭৬ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। হঠাৎ করে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে নতুন করে শুরু হয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসছে শীতে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ব্যাপক হারে বাড়তে পারে বলে আগে থেকেই শঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু শীত নামার আগেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়তে শুরু করেছে। মানুষ সচেতন না হলে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে এই শীতে করোনা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তারা বলছেন, টিকা আসার আগ পর্যন্ত মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এটি সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। একই সঙ্গে টেস্টিং ফ্যাসিলিটি বৃদ্ধি, আইসোলেশন ও চিকিৎসা এবং বিদেশ-ফেরতদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে। এসব কার্যক্রমে অবহেলা করা হলে করোনা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এদিকে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে সর্বস্তরের মানুষের মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধির মেনে চলার ওপর কঠোরতা এনেছে সরকার। সবাইকে মাস্ক পরার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপন জারি ও বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে কাজ না হওয়ায় শেষমেশ হার্ডলাইনে গেছে সরকার। গতকাল রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় মাস্ক না পরায় ভ্রাম্যমাণ আদালত সহস্রাধিক মানুষকে জেল-জরিমানা করেছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই অভিযান চলমান থাকবে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র। প্রয়োজনে প্রশাসন আরো কঠোর হবে।

অন্যদিকে বিদেশ থেকে করোনা ভাইরাসের ‘নেগেটিভ’ সনদ নিয়ে এলেও দেশে টেস্ট করা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন। গতকাল ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক মতবিনিময় সভা শেষে তিনি বলেন, বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীদের কোভিড টেস্ট করতে কড়াকড়ি করা হয়েছে। প্রত্যেকেরই টেস্ট করা হবে। যদি কারো পজিটিভ হয় তাহলে তাকে আইসোলেশনে পাঠানো হবে। আর যাদের নেগেটিভ হবে তারা সেলফ আইসোলেশনে যাবেন।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেছেন, ‘বাংলাদেশে করোনার সামাজিক সংক্রমণ চলছে। আমাদের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর একসময় চ‚ড়ায় পৌঁছেছিল। এরপর সংক্রমণ কমতে শুরু করলেও কখনই নিয়ন্ত্রিত হয়নি। তবে যেহেতু সামনে শীত, এই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে। কারণ শীতকালে ঠাণ্ডাজনিত রোগ ব্রঙ্কাইটিস, ফেরিনজাইটিস, নিউমোনিয়া ছাড়াও সাধারণ জ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় সংক্রমণ বাড়বে। যেহেতু এগুলো শ্বাসজনিত রোগ আর করোনায় মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো শ্বাসজনিত সমস্যা। সুতরাং শিশু ও বয়স্ক যারা ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতায় ভুগবে, যাদের ফুসফুসে সংক্রমণ আছে তাদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে- করোনা থেকে বাঁচার উপায় দুটি। একটি হচ্ছে টিকা, অন্যটি স্বাস্থ্যবিধি মানা। যত দিন পর্যন্ত টিকা না আসছে, তত দিন পর্যন্ত জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে এবং রাষ্ট্রেরও জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে বাধ্য করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, করোনা থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক পরার কোনো বিকল্প নেই। মাস্ক হলো ভ্যাকসিনের বিকল্প। তাই সবারই মাস্ক পরতে হবে। সবার মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে।

৫৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু: করোনা ভাইরাসে দেশে এক দিনেই আরো ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত ৫৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই এক দিনে আরো ২ হাজার ২১২ জনের শরীরে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যা গত ৭৬ দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ফলে করোনায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৮৪ জন ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ২৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল বিকেলে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ তথ্য জানায়।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর এর চেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; সেদিন ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আর গতকালের চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের খবর সর্বশেষ এসেছিল গত ২ সেপ্টেম্বর; সেদিন ২ হাজার ৫৮২ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার খবর জানানো হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরো ১ হাজার ৭৪৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন গত এক দিনে। তাতে সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার ৮৯৫ জন হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১১৭টি ল্যাবে ১৫ হাজার ৯৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৯৫২টি নমুনা। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮০ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

গত এক দিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ৩০ জন পুরুষ আর নারী ৯ জন। তাদের সবাই হাসপাতালে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি, ১০ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ২ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে এবং ১ জন করে মোট ৩ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০, ২১ থেকে ৩০ ও ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ছিল।

মৃতদের মধ্যে ২২ জন ঢাকা বিভাগের, ৫ জন করে মোট ১০ জন চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের, ৩ জন রাজশাহী বিভাগের এবং ২ জন করে মোট ৪ জন বরিশাল ও সিলেট বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

দেশে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৬ হাজার ২৫৪ জনের মধ্যে ৪ হাজার ৮১৩ জনই পুরুষ এবং ১ হাজার ৪৪১ জন নারী। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ২৯০ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এ ছাড়া ১ হাজার ৬৪২ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ৭৬৮ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, ৩৩২ জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, ১৪৪ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে, ৪৯ জনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এবং ২৯ জনের বয়স ছিল ১০ বছরের কম। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৮৩ জন ঢাকা বিভাগের, ১ হাজার ২২৩ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৩৮২ জন রাজশাহী বিভাগের, ৪৮২ জন খুলনা বিভাগের, ২০৯ জন বরিশাল বিভাগের, ২৫৯ জন সিলেট বিভাগের, ২৮৬ জন রংপুর বিভাগের এবং ১৩০ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল গত ৮ মার্চ। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে ২৪তম স্থানে আছে বাংলাদেশ, আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৩২তম অবস্থানে।

খবর সারাবেলা / ১৮ নভেম্বর ২০২০ / এমএম