অসমান গতিতে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার
বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত কিংবা মৃত্যুর হার একদিন কমলে আবার পরেরদিন লাফ দিয়ে বেড়ে যাচ্ছে। বিগত এক সপ্তাহে চিত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে এমন চিত্র। সংকটময় এই সময়ে এসে জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে শীতিলতা আনা হয়েছে করোনা নিয়ন্ত্রয়ণ কার্যক্রমে। এমতাবস্থায় ভারসাম্যহীন গতীতে প্রতিনিয়ত হু হু করে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা।
সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে আরো ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে আক্রান্ত হিসেবে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ৫৬৭ জন আর সুস্থ হয়েছেন দুই হাজার ৫১ জন। দেশে করোনা দেখা দেয়ার ১৯৬ দিনে সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৯১৩ জনের। আর তিন লাখ ৪৭ হাজার ৩৭২ জন শনাক্ত ও দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৮৬ জন সুস্থ হয়েছেন।
বিগত এক সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, শুক্রবার করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছেন, নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ৫৪১ জন, এর আগে বৃহস্পতিবার আরো ৩৬ জনের মৃত্যু ও শনাক্ত হয়েছেন এ হাজার ৫৯৩, বুধবার আরো ২১ জনের মৃত্যু ও শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬১৫, মঙ্গলবার আরো ২৬ জনের মৃত্যু ও ১ হাজার ৮১২ জন শনাক্ত, সোমবার আরো ২৬ জনের মৃত্যু ও এক হাজার ৮১২ জন শনাক্ত, রবিবার ৪ জনের মৃত্যু ও এ হাজার ২৮২ জন শনাক্ত এবং শনিবার করোনায় আরো ৩৪ জনের মৃত্যু ও শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ২৮২।
করোনা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনা ভাইরাস শনাক্তের জন্য যত বেশি টেস্ট করা হবে, ততই মহামারী নিয়ন্ত্রণ হবে। তবে শত ভাগ মানুষের করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করার দরকার নেই।
তবে রোগ তাত্ত্বিক চিত্র বোঝতে হলে সার্ভিলেন্সের নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা সেটা মুখ্য বিষয়। সার্ভিলেন্সের নিয়ম অনুসারে সকল অঞ্চল থেকে স্যাম্পল আসছে কিনা সেটা দেখতে হবে। ৬৪ জেলা থেকেই বর্তমানে আমাদের স্যাম্পল পরীক্ষা করা হচ্ছে।
করোনা ভাইরাসের লক্ষণ রয়েছে এমন মানুষদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে যাদের করোনা ভাইরাস শনাক্ত হবে, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও টেস্ট করতে হবে। বর্তমানে আমাদের কন্ট্রাক্ট টেস্টিং সব জায়গায় সমানভাবে হচ্ছে না। এ বিষয়ে আমাদের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের করোনা বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির বিশেষজ্ঞরাও বলেছেন যদি আরটি পিসিআর এ টেস্টের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব না হয়, যেখানে আরটি পিসিআরের ব্যবস্থা নাই, সেখানে প্রয়োজনে অ্যান্টিজেন টেস্ট করা উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বর্তমানে কিছু শর্তসাপেক্ষে অ্যান্টিজেন টেস্টের অনুমতি দিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও অ্যান্টিজেন টেস্টের কথা বলেছে।
তবে কোনো এক জটিলতায় এটা এখনো চালু হচ্ছে না। আরটি পিসিআরের পাশাপাশি প্রয়োজনে এন্টিজেন টেস্ট চালু করা উচিত। তাহলে আরো বেশি রোগী শনাক্ত করা সম্ভব হবে। যত দ্রুত রোগীকে শনাক্ত করে আইসোলেটেড করা সম্ভব হবে, ততোই তাড়াতাড়ি আমরা করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। পাশাপাশি আমাদের সর্বক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক পরতে হবে, নিয়মিত হাত সাবান দিয়ে হাত ধুতে এবং নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
এদিকে গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয় ১২ হাজার ৫৮৭টি। নমুনা পরীক্ষা করা হয় ১৩ হাজার ১৭০টি। এখন পর্যন্ত ১৮ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, শনাক্ত বিবেচনায় গত ২৪ ঘণ্টায় প্রতি ১০০ নমুনায় ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত বিবেচনায় প্রতি ১০০ জনে সুস্থ হয়েছে ৭৩ দশমিক ২৩ জন এবং মারা গেছে ১ দশমিক ৪১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ২৫ জন পুরুষ এবং সাতজন নারী। এখন পর্যন্ত পুরুষ তিন হাজার ৮২৯ জন এবং নারী মৃত্যুবরণ করেছেন এক হাজার ৮৪ জন।
বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০ বছরের বেশি ১৭ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে আটজন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে চারজন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে একজন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে একজন এবং ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে একজন।
বিভাগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে একজন, খুলনা বিভাগে দুইজন, বরিশালে একজন, রংপুরে একজন, ময়মনসিংহে চারজন এবং সিলেটে একজন। ২৪ ঘণ্টায় ৩২ জনের সবাই হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর আরো জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে রাখা হয়েছে ৩১২ জনকে। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ১৭ হাজার ৩২ জন। ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশন থেকে ছাড় পেয়েছেন ২০২ জন। এখন পর্যন্ত ছাড় পেয়েছেন ৬১ হাজার ৬৯৭ জন।
এখন পর্যন্ত আইসোলেশন করা হয়েছে ৭৮ হাজার ৭২৯ জনকে। প্রাতিষ্ঠানিক ও হোম কোয়ারেন্টাইন মিলে ২৪ ঘণ্টায় কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে ৭১৮ জন। কোয়ারেন্টাইন থেকে গত ২৪ ঘণ্টায় ছাড় পেয়েছেন এক হাজার সাত জন। এখন পর্যন্ত ছাড় পেয়েছেন চার লাখ ৭৫ হাজার ১৫৯ জন। এখন পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৫১৪ জনকে। বর্তমানে কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৭ হাজার ৩৫৫ জন।
খবর সারাবেলা / ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ / এমএম




