বেড়েছে গাড়ি, পাড়া-মহল্লায় ভিড়
করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের লাগাম টেনে ধরতে আরোপিত কঠোর লকডাউনের তৃতীয় দিনে শনিবার রাজধানীতে মানুষের চলাচল আগের দু’দিনের তুলনায় বেড়েছে। মানুষকে ঘরে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি ও সেনাসদস্যদের সরব ভূমিকার কারণে প্রধান সড়কে যান চলাচল এবং লোক সমাগম কম হলেও পাড়া-মহল্লায় অহেতুক ভিড় দেখা গেছে।
কাঁচাবাজারগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। উপেক্ষিত ছিল স্বাস্থ্যবিধি। তাই বাধ্য হয়ে বিধিনিষেধ মানাতে পাড়া-মহল্লায় কঠোর অভিযান পরিচালনার করা হবে বলে জানিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
লকডাউনের তৃতীয় দিনে অনেকেই বিভিন্ন কাজে বাইরে বের হতে দেখা গেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরছেন। বাইরে বের হওয়ার কারণ যুক্তিযুক্ত মনে হলে তাদের সহায়তা করেছেন। যাদের বাইরে বের হওয়ার করণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না, তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় আইনানুগ ব্যবস্থা। একই চিত্র ছিল ঢাকার বাইরের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও জেলা-উপজেলায়।
গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাবলিক রিলেশনস জানায়, কঠোর বিধিনিষেধ ভঙ্গ করে সড়কে গাড়ি চলানোর দায়ে ৮৮৫ মামলায় ১৯ লাখ ২২ হাজার ৫৫০ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ট্রাফিক বিভাগ। নিয়ম অমান্য করে ঘরের বাইরে আসায় ৬২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৩৪৬ জনকে জরিমানা করা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৪৫০ টাকা।
শনিবার রাজধানীর পল্টন, মালিবাগ, আজিমপুর, মিরপুর, ধানমণ্ডিসহ রাজধানীর সব প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ ছিল বেশি বেড়েছে। নিউ মার্কেট, নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল এলাকায় ছিল রিকশার রাজ্যত্ব। ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল অনেক। বাজারগুলোতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মানুষের ভিড় ছিল প্রচুর।
বিধিনিষেধ মানাতে নগরীর পথে পথে আগের মতোই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে। পুলিশের তল্লাশি পেরিয়েই বাইরে বের হতে হচ্ছে সবাইকে। এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় সেনাসদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
কারওয়ানবাজার, মিরপুর, খিলগাঁও এলাকা ঘুরে দেখে গেছে, আগের দুই দিনের মতো গতকালও সড়ক ছিল অনেকটাই ফাঁকা। তবে গত দুই দিনের তুলনায় কিছুটা মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। সেইসঙ্গে কিছু প্রাইভেট যানবাহন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ছাড়া অন্য যানবাহন চলতে দেখে যায়নি। কিছু কিছু অফিস খোলা থাকায় সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অফিসের গাড়ি অথবা রিকশায় চলাচল করেছেন।
দুপুরে খিলগাঁও রেলগেট এলাকার অলিগলিতে দোকান-পাট গত দুই দিনের তুলনায় একটু বেশি খোলা দেখা গেছে। মানুষের উপস্থিতিও বেশি। পুলিশের টহল না থাকায় ইচ্ছেমতো নিজেদের মতো ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে বহু মানুষকে। অনেকের মুখে কোনো মাস্ক ছিল না। রেলগেটে কিছুসংখ্যক পুলিশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তাদের তৎপরতা ছিল কম। এতে করে যে যার মতো চলাচল করেছে।
তিলপাপাড়া জামে মসজিদের সামনে বেশ কয়েকজন যুবককে আড্ডা দিতে দেখা গেছে। তাদের একজন শরিফুল ইসলাম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাসায় একা একা সময় কাটাতে আর ভালো লাগছে না। তাই বন্ধুদের ফোন করে এই জায়গায় আসতে বলেছি। একটু সময় কাটাতে। এখন বসে একটু গল্প করছি।’
সকালে কলাবাগান এলাকার প্রধান সড়কে যানবাহনতুলনামূলক কম ছিল। তবে অলিগলিতে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল দেখা গেছে। কেউ সকালের নাস্তা কিনতে কিংবা কেউ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। তবে এলাকার ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি মানতে নারাজ সাধারণ মানুষ। প্রধান সড়কে মাস্ক পরে চলাচল করলেও অলিগলিতে মাস্ক পরার প্রতি উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।
পুরান ঢাকার প্রধান সড়কগুলোয় যান চলাচল ছিল একেবারেই সীমিত। প্রয়োজন ছাড়া বের হলেই পড়তে হচ্ছে পুলিশের জেরায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশের চেকপোস্ট। মূলত লকডাউনের মধ্যে যে সব অফিস খোলা রাখা হয়েছে, সেখানকার কর্মীদের বহনকারী স্টাফ বাস, দুই-একটি প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, রিকশা ও অ্যাম্বুলেন্স চলতে দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তায় পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, র্যাব, আনসার এবং সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ প্রাইভেটকার থামিয়ে পরিচয়পত্র যাচাই করছিলেন তারা। সত্যতা না মিললে গুনতে হয়েছে জরিমানা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার জসিম উদ্দিন মোল্লা জানান, দুপুর ১টা পর্যন্ত ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে আর ৪৫ জনকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, সরকারের নিষেধাজ্ঞার পরও যারা যৌক্তিক কারণ ছাড়া রাস্তায় বের হয়েছে কিংবা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করবে, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
গাবতলী চেকপোস্টে ডিউটিরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আসাদুর রহমান বলে, ‘যাদের বাইরে বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ আমরা মনে করছি, তাদের রাজধানীর বাইরে যেতে দিচ্ছি। অনেককেই আমরা মামলা দিচ্ছি, যারা বাইরে বের হওয়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না।’
রাজধানীর রাসেল স্কয়ারে বিধিনিষেধে র্যাবের কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে যারা বাইরে বের হচ্ছেন তাদের অনেকেই সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান করছেন না। সচেতনতার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
খবর সারাবেলা / ০৪ জুলাই ২০২১ / এমএম




