করোনার ‘তেজ’ কমছে
শীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার হু হু করে বাড়লেও এর ঠিক উল্টো চিত্র বাংলাদেশে। এই শীতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে কমছে ‘করোনার তেজ’। টানা ১১ দিন ধরে দেশে ধীরে ধীরে কমে আসছে শনাক্তের সংখ্যা। এরমধ্যে গত ২ দিন শনাক্তের হার ছিল হাজারের নিচে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মানুষের মাঝে যেহেতু ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বেড়ে গেছে, সেহেতু করোনা বাড়তে পারছে না। তাই আগামী দিনগুলোতে সংক্রমণ কমবে, যদি না যুক্তরাজ্যের ভাইরাস আমাদের দেশে ঢুকে। তবে নতুন করোনা ভারাইসটি প্রবেশ করলেও বর্তমান হার্ড ইমিউনিটি কাজ করতে থাকবে।
তারা বলছেন, এই শীতের মধ্যেই আরো কমতে পারে করোনার প্রকোপ। কারণ, কোনো একটি ভাইরাস যখন কারো শরীরে প্রবেশ করে, তখন অন্য ভাইরাস সেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে না।
হার্ড ইমিউনিটি বা গণপ্রতিরোধ ক্ষমতা বলতে কী বুঝায় সে সম্পর্কে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহামারীর ক্ষেত্রে যখন দেশের একটা বিরাট অংশ (করোনার ক্ষেত্রে শতকার ৭০ ভাগ) এই রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন এই রোগটা আর মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে না। তখন বলা যায়, হার্ড ইমিউনিটি বা গণপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে শীতেও করোনা সংক্রমণ কম কেন জানতে চাইলে করোনা বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, শীতে তো সব দেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বাড়ে। তবে আমাদের দেশে কমতে পারে। আমাদের দেশে আইসিডিডিআরবি ও আইইসিডিসিআর যৌথভাবে স্টাডি করেছিল। সেখানে দেখা গেছে, বস্তি এলাকায় সংক্রমণের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অ্যান্টিবডি ৭৪ শতাংশ। আর নন-বস্তি এলাকায় সংক্রমণের হার ৯ শতাংশ। অ্যান্টিবডি ৫৪ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায় বস্তি এলাকাতে করোনার সংক্রমণ কম। আমিও বেশ কিছুদিন আগে একটা গবেষণা করেছিলাম। সেখানে দেখেছি বস্তি এলাকায় চারটি ভাইরাসের উপস্থিতি ছিল বেশি।
শীতে দেশে করোনা প্রাদুর্ভাব কমার কারণ হিসেবে বিএসএমএমইউ-এর সাবেক এই উপাচার্য দেশে চারটি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্যারা ইনফ্লুয়েঞ্জা থ্রি, রেসপিরেটরি সিনসিডিয়াল ভাইরাস এবং রায়নো ভাইরাস সংক্রমণ দেখা যায়। এসব ভাইরাসের কারণে মানুষের সর্দি-কাশি-জ্বর হয়ে থাকে। যখন এই চারটি ভাইরাসের একটি কারো শরীরে প্রবেশ করে তখন অন্য একটি ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে না। যদিও অন্য কোনো ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে তাও প্রকাশ পায় না।’
অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা দেখেছি জুন জুলাইয়ে যে সংক্রমণের হার ছিল তা এখন অনেকটা কমে গেছে। ধীরে ধীরে আরো কমে যেতে পারে। ইউরোপ আমেরিকার মানুষ অনেক কষ্ট করছে। সেই তুলনায় আমাদের দেশের মানুষ অনেক ভালো রয়েছে। আমাদের দেশে সংক্রমণ কমছে, তবে মৃত্যুর হার কমছে না। এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ঝামেলা আছে।
শীতেও বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়া সম্পর্কে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাবেক অণুজীব বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীল বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ পশ্চিমে বেড়েছে। তবে আমাদের অঞ্চলে কমে গেছে। এর মূল কারণ, আমাদের হার্ড ইমিউনিটি বেড়েছে। আরেকটা কারণ হতে পারে, শীতকালে মানুষ ঘর থেকে কম বের হয়। এ ছাড়া শীতে মানুষ নাক ঢেকে রাখে, সেটা মাস্ক হোক কিংবা মাফলার- যা দিয়ে হোক। এতে করোনা ছড়াতে পারছে না’।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যেহেতু হার্ড ইমিউনিটি বেড়ে গেছে, সেহেতু করোনা গ্রো করার জায়গা পাচ্ছে না। তাই আগামী দিনগুলোতে সংক্রমণ কমবে, যদি না যুক্তরাজ্যের ভাইরাস আমাদের দেশে ঢুকে।’তবে তিনি মনে করেন, নতুন করোনা ভারাইসটি প্রবেশ করলেও বর্তমান হার্ড ইমিউনিটি কাজ করবে। ১০০ ভাগ না হলেও ৯০ ভাগ তো কাজ করবে।
বিগত দিনের করোনার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ৮ মার্চ দেশে ৩ জন রোগীর শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। এর ১০ দিনের মাথায় করোনায় মৃত্যু হয় এক জনের। ৮ মার্চের পর থেকেই প্রতিদিনই হু হু করে বাড়তে থাকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। মে-জুন মাসে দেখা দেয় করোনা প্রাদুর্ভাবের পিক সময় (সর্বোচ্চ সময়)। ওই সময়ে দেশে প্রতিদিন ৪ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছিল এবং মারা গেছে ৫০ জনের বেশি।
রোগী শনাক্তের হার দাঁড়ায় ২৪ থেকে ২৫ শতাংশ। অক্টোবরের শুরুতে সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে সংক্রমণ হার নেমে আসে ১০-১১ শতাংশে। তবে নভেম্বর শেষ সপ্তাহ দেশে দেশে শীতের প্রকোপ দেখা দিলে বাড়তে শুরু করে শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। এর ধারা অব্যাহত থাকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ওইদিন করোনায় আক্রান্ত হিসাবে শনাক্ত করা হয় ২ হাজার ৪১৬ জন রোগী। এর পরদিন ২৪ ডিসেম্বর থেকে কমে আসতে শুরু করে সংক্রমণের গতি।
গত ২ দিন শনাক্তের সংখ্যা ছিল হাজারের নিচে। এর মধ্যে ২ জানুয়ারি ৯৬৪ জন ও ৩ জানুয়ারি ৯৭৮ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
২৪ ঘণ্টায় আরো ২৭ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ৮৩৫: করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষায় আরো ৮৩৫ জন শনাক্ত এবং বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন আরো ৯৭৮ জন। সবমিলিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ৬২৬ জন, শনাক্ত করা হয়েছেন ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৯ জন আর সুস্থ হয়েছেন ৪ লাখ ৬০ হাজার ৫৯৮ জন।গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতর এতে আরো জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১০ হাজার ৮৬৭টি। অ্যান্টিজেন টেস্টসহ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১০ হাজার ৯২৫টি। এখন পর্যন্ত ৩২ লাখ ৬০ হাজার ৩২৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ওই সময়ে শনাক্তের হার ৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত শনাক্ত ১৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছেন ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার এক দশমিক ৪৮ শতাংশ।
গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ১৬ জন পুরুষ এবং ১১ জন নারী। এখন পর্যন্ত পুরুষ ৫ হাজার ৭৯৭ জন এবং নারী মৃত্যুবরণ করেছেন এক হাজার ৮২৯ জন। বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, মারা যাওয়াদের মধ্যে ৬০ ঊর্ধ্ব ১৯ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৫ জন এবং ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৩ জন রয়েছেন। বিভাগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪ জন, খুলনা বিভাগে একজন, রংপুর বিভাগে ৩ জন এবং সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে ২ জন করে রয়েছেন।
খবর সারাবেলা /০৪ জানুয়ারি ২০২১/এমএম




