নতুন বছরে আতঙ্ক বাড়িভাড়া
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মোরশেদ আলম। রুটি-রুজির তাগিদে প্রায় দেড় দশক আগে ঢাকায় আসেন। কয়েক বছর আগে বিয়ে করেছেন তিনি। স্ত্রী ও সন্তানকে ঢাকায় আনার পরই বাড়িভাড়া নিয়ে পড়েন বিপাকে। সাধ্যের মধ্যে পরিবার নিয়ে থাকার বাসা মিলছিল না।
পরে এক বন্ধুর সঙ্গে ভাগাভাগির ভিত্তিতে ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। এখন দুই বন্ধু মিলে রাজধানীর রামপুরায় বসবাস করছেন। ভাড়া ফ্ল্যাটে ভাগাভাগি করে থাকলেও শুধু চাকরির বেতনে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। টিকে থাকতে চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করতে হচ্ছে তাকে।
মোরশেদ বলেন, ঢাকায় বসবাসের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তদের জন্য বাড়িভাড়া অনেকটা বিষফোঁড়ার মতো। শুরুতে যে বেতন পেতাম তা দিয়ে মেসে কোনোমতে থাকতে পারতাম। কয়েক বছর হলো বিয়ে করেছি। এখন একটা সন্তানও আছে আমাদের। মধ্যমমানের একটি বাসা নিতেই সব চার্জসহ ১৬ হাজার টাকা লাগে। মাস শেষে ভাড়া পরিশোধে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। তবু রুটি-রুজির তাগিদে থাকতে হচ্ছে ঢাকায়।
তিনি আরো বলেন, ‘টিকে থাকতে চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করছি। কখনো রাইড শেয়ারিং, অনলাইন পণ্য ডেলিভারির কাজও করি। স্ত্রী-সন্তানকে অতিরিক্ত কাজের বিষয়টি বুঝতেও দিই না।’
মোরশেদ বলেন, ‘বাড়িভাড়া দিতেই বেতনের বেশিরভাগ অংশ চলে যায়। ছয় মাস গেলেই বাড়িভাড়া বাড়ানোর পাঁয়তারা করেন মালিক। নামে-বেনামে বিভিন্ন সার্ভিস চার্জ বাড়িয়ে দেন। মানসিক যন্ত্রণায় দিন পার করতে হচ্ছে।’
পরিসংখ্যান মতে, রাজধানীতে প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ৮০-৯০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকে। মোরশেদ আলমের মতো বেসরকারি চাকরি কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা করে ঢাকায় টিকে থাকার লড়াই করা মানুষের সংখ্যা লাখ লাখ। নিম্ন আয়ের মানুষ মাস শেষে বাড়িভাড়া গুনতেই হিমশিম খান। বাড়িভাড়া দিতে না পেরে এক সময় গ্রামে ফিরে যেতে হয় তাদের। আবার কখনো কখনো ঘরের জিনিস আটকে রেখেও বাড়িভাড়া আদায় করেন মালিক। কখনো নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।
এমন সংকটের কারণেই করোনাকালে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত অনেকের চাকরি চলে যাওয়া কিংবা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামে চলে গেছেন লাখ লাখ মানুষ। এখনো তারা ফিরতে পারেননি। যারা আছেন তারাও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে দিনাতিপাত করছেন।
ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, করোনা শেষ না হলেও বাড়িওয়ালারা নতুন বছর থেকে বাড়িভাড়া বাড়ানো হবে বলে তাদের জানিয়েছেন। ভাড়াটিয়াদের কল্যাণে কাজ করা সংগঠন ‘ভাড়াটিয়া পরিষদ’ বলছে, তারা শুনেছেন নতুন বছর থেকে বাড়িভাড়া বাড়ানোর চিন্তা করছেন মালিকরা। সে জন্য তারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সেলিম হোসেন (ছদ্মনাম)। করোনা পরিস্থিতিতে হুট করে অফিস থেকে বেতন কমিয়ে দেয়ার কথা জানানো হয় তাকে। কিন্তু ঢাকায় অবস্থান করেই কাজ করতে হবে তাকে। করোনা শুরু হওয়ার আগেই তিনি বিয়ে করেছিলেন। বেতন অনুপাতে বাসাও ভাড়া নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বাড়িভাড়া নিয়ে বাড়িওয়ালাদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। প্রয়োজনের তাগিদে আমাদের থাকতে হয়। বাড়িভাড়ার বিষয়টি সরকার কিংবা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তদারকি করা হলে হয়তো বিড়ম্বনা কিছুটা কমবে।’
হাতিরঝিল এলাকায় চারজন মিলে দুই রুমের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। সবাই ব্য়াচেলর। তাদের একজন ফারুক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মাস শেষে যে বেতন পান বাড়িভাড়া দিতেই অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। কথায় কথায় তিনি বলেন, ‘ঢাকায় তো বাড়িভাড়া গুনতেই আমাদের সব শেষ হয়ে যায়। বাড়িভাড়া পরিশোধের পর হাতে যে টাকা থাকে, তা দিয়ে মাসের খাওয়াও হয় না ঠিকমতো। মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা ধার করতে হয়।’
তিনি বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। যেন বাড়িওয়ালারা ইচ্ছামতো ভাড়া নিতে না পারেন। বাড়িভাড়ার বিড়ম্বনা নিয়ে লাখ লাখ মানুষ ভোগান্তি পোহাচ্ছে। অথচ সমাধানের বিষয়ে সরকার কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।
ভাড়াটিয়ারা জানান, প্রতি বছরের শুরুতেই বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা করেন। অনেক বাড়িওয়ালা জানুয়ারি থেকে ভাড়া বাড়ানো হবে বলেও জানিয়েছেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানো যায় না। আবার জামানতও নেয়া যাবে না। এ জন্য ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকপক্ষকে চুক্তিবদ্ধ হতে হয়। কিন্তু এসবের কোনো কিছুই মানা হয় না।
বাড়িভাড়া না বাড়ানোর দাবিতে মানববন্ধন : আগামী বছর বাড়িভাড়া বাড়ানো বন্ধের দাবি জানিয়েছে ভাড়াটিয়া পরিষদ। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে এ দাবি জানান হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বছরের প্রথম মাসে বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া বাড়ানোর একটি অলিখিত নিয়ম চালু করে রেখেছেন। চলতি বছর করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া এমনিতেই দিশেহারা। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে বাড়িওয়ালাদের বাড়িভাড়া বাড়ানোর নোটিশে ভাড়াটিয়াদের বাড়তি উদ্বেগে ফেলেছে। এই নির্মম অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায়ও থাকে না।
মানববন্ধনে সাধারণ ভাড়াটিয়াদের দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে ভাড়াটিয়া পরিষদের পক্ষ থেকে করোনাকালীন মার্চ থেকে মে এই তিন মাসের বাড়িভাড়া ও দোকানভাড়া মওকুফের মানবিক আবেদন জানানো হয়। যেসব বাড়িওয়ালা মওকুফ করেছেন, তাদের ধন্যবাদও জানানো হয়।
ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহারানে সুলতান বলেন, করোনার এই বিশেষ পরিস্থিতিতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির মতো অমানবিক সিদ্ধান্ত কোনো ভাবেই কাম্য হতে পারে না। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকনির্দেশনামূলক ঘোষণা থাকা প্রয়োজন। মানববন্ধনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ ভাসানীর মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, আওয়ামী ওলামা লীগের সদস্যসচিব মুফতি মাসুম বিল্লাহ, ভাড়াটিয়া পরিষদের নেতা কিরণ মৃধা, জামাল শিকদার, মাসুদুর রহমান সহ আরো অনেকে বক্তব্য রাখেন।
খবর সারাবেলা / ২৩ ডিসেম্বর ২০২০/এমএম




