জলের গ্রাসে হুমকিতে দেশ

October 13, 2020

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে রয়েছে নদীর পানিতে। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। শরীয়তপুরে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি।

জাজিরার বড়কান্দি ইউনিয়নের দুর্গারহাট এলাকা ও কুরেরচর ইউনিয়নের সিডার চরেও একই অবস্থা। নিঃস্ব অবস্থায় আপাতত পাশের গুচ্ছগ্রামের উঁচু জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ। এভাবেই সারা দেশে মহামারী রূপ নিয়েছে নদীভাঙন। জলের গ্রাসে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে দেশের ৩৩টি জেলাকে ডেঞ্জার জোন (প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনপ্রবণ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে এসব জেলাকে আবার প্রকৃতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ছয়টি গ্রুপে ভাগ করে উত্তরণের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বদ্বীপ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে নদীভাঙন রোধ, নদী শাসন ও নাব্যতা রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের এই কর্মকৌশল বাস্তবায়িত হলে নদী ও নদীর মোহনায় পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। সেইসঙ্গে দেশে বন্যার ঝুঁকি হ্রাস পাবে, নদীভাঙন রোধও সম্ভব হবে। উপক‚ল এলাকায় নতুন ভ‚মি জাগবে। দেশের আয়তন বাড়বে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানসহ সার্বিক জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার এ বিষয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী ভাঙন রোধে উদ্যোগ নিয়েছেন। আমরা এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আশা করছি, আগামীতে ভাঙনজনিত সমস্যা আর থাকবে না।তিনি বলেন, আমি নিজেই যমুনাপারের লোক। দুইবার আমার দাদা ও শ্বশুরবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়েছে। আমি জানি ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের সমস্যা আর দুঃখ-দুর্দশার কথা।’

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রতি বছর দেশে ব্যাপক বন্যা হয়। চলতি বছর এ বন্যা জুন থেকে শুরু হয়। এখনো অতি-বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন জেলায় বন্যা অব্যাহত আছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের রংপুরে রেকর্ড বৃষ্টিতে নাকাল সেখানকার মানুষ। টানা বৃষ্টিপাত চলছে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায়। কর্মব্যস্ত মানুষের ঘর থেকে বের হওয়াই দুরূহ হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের বন্যায় ৩৩ জেলা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঁচা-ঘরবাড়ির পাশাপাশি গবাদিপশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্যোগ মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে সরকার।

তথ্যমতে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৩৩ জেলার নদীভাঙন কবলিত এলাকাকে ছয় ধরনের ক্যাটাগরিতে ক্ষতি নির্ধারণ করে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতীর ভাঙনরোধ, তীর সংরক্ষণ কাজের ক্ষতি, বাঁধের ব্রিজ, বাঁধের সম্পূর্ণ ও আংশিক ভাঙন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো উন্নয়নে ১০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আরো ৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ তীরের মেরামতকাজ চলছে।

এ ছাড়া বন্যায় নদীভাঙন রোধ, বাঁধ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রয়োজনীয় জিওব্যাগ ও সরঞ্জাম নিয়ে মেরামতকাজে নিয়োজিত রয়েছেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবে সরকার। এ জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পাউবোর বাস্তবায়নাধীন ১০১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৩টি নদীতীর সংরক্ষণধর্মী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

এদিকে, বিষয়টি নিয়ে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত ৩৩৪ উপজেলার ৬৬ শতাংশে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি ইউনিয়নে ২ থেকে ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর রক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে উন্নয়ন সংস্থা সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান বলেন, প্রতি তিন-চার বছর পরপর দেশে বড় বন্যা হয়, এবারও তা-ই ঘটছে। ফলে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে বন্যা স্থায়ী হয়েছে। তা ছাড়া পানির স্রোতও বেশি। প্রতিবছর নদীভাঙনের যে পূর্বাভাস দেয়া হয় তা আমলে নিয়ে নদীপারের অবকাঠামো নির্মাণ করলে এভাবে বিপুল সম্পদের বিনাশ হতো না বলেও মনে করেন তিনি।

খবর সারাবেলা / ১৩ অক্টোবর ২০২০ / এমএম