ঘরে বসেই কোরবানির পশু কেনাবেচা
দেশে করোনা মহামারী তিন মাস পেরিয়ে গেলেও সংক্রমণ থামছে না। তাই আসন্ন কোরবানি ঈদের পশুর হাট নিয়ে এখনই নড়েচড়ে বসেছে সরকার। পরিস্থিতি বিবেচনায় ইতোমধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর হাট না বসানোর সুপারিশ করেছে করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। তার বদলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পশু কেনাবেচার ব্যবস্থা করতে বলেছেন তারা। এই করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধির কথা চিন্তা করে সারা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সম্ভাব্য হাটগুলোয় কঠোর নজরদারির দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মাঠ-ঘাট, হাটবাজারে পশুর হাট বসিয়ে সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মানানো একেবারেই অসম্ভব। তাই খামারি ও ক্রেতাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ কোরবানির পশু কেনাবেচার জন্য ডিজিটাল হাটের ব্যবস্থা করেছে। কোরবানির পশু কেনার জন্যও হাটে না গিয়ে এবার অনলাইনেই হতে পারে বেশিরভাগ বিকিকিনি।
সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ কোরবানির পশু বেচাকেনার জন্য ডিজিটাল হাটের ব্যবস্থা করেছে। এটি হবে সরকারি উদ্যোগে দেশের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল কোরবানির পশুর হাট। এই হাটে ক্রেতারা ঘরে বসেই গরুর ছবি-ভিডিও দেখা ও লাইভ ওজন জানার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে গৃহস্থ, খামারি বা বেপারিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার সুযোগ পাবেন ক্রেতা। এরপর নির্দিষ্ট স্থান থেকে অথবা হোম ডেলিভারির ভিত্তিতে টাকা দিয়ে গরু সংগ্রহ করতে পারবেন।
এ ছাড়া ঢাকা-উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কোরবানির পশু বিক্রির লক্ষ্যে এটুআই ও ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহযোগিতায় অনলাইন প্লাটফর্ম ‘ডিএনসিসি ডিজিটাল হাট’ গতকাল শনিবার উদ্বোধন করেছে। ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার ও পল্লীউন্নয়ন মন্ত্রী তাজুল ইসলাম।
বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান, এফবিসিসিআইর সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশেনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইমরান হোসেন। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন সিপিডির সিনিয়র গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট শমী কায়সার। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনের পর স্থানীয় সরকার ও পল্লীউন্নয়নমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী অনলাইন হাট থেকে একটি করে গরু কেনেন।
অনলাইন হাটের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ডিএসসিসিও। সংস্থাটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিন এ ব্যাপারে মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘অনলাইন পশুর হাটের বিষয়ে ভাবছে ডিএসসিসিও। আগামীকাল (আজ) এ ব্যাপারে আমাদের একটা জরুরি বৈঠক আছে। সেখানে মেয়র মহোদয়ও থাকবেন। সেই বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’
জানা গেছে, দেশের সর্ববৃহৎ এ ডিজিটাল হাটের জন্য সারা দেশ থেকে গরু-ছাগলের চাষি, খামারের মালিক ও সাধারণ পশু ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা (যঃঃঢ়ং://ভড়ড়ফভড়ৎহধঃরড়হ.মড়া.নফ/য়ঁৎনধহর২০২০) সাইটে বিনামূল্যে নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। নিবন্ধনের পর নিজস্ব প্যানেল থেকে পশুর ছবি, ভিডিওসহ অন্যসব তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। এসব ছবি ও তথ্য ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার নিজস্ব খরচে প্রচার করবে। ফলে ক্রেতারা সহজেই তাদের কোরবানির পশু পছন্দ করে বিক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ডেলিভারি সুবিধা নিতে পারবেন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘ফুড ফর নেশন’ প্লাটফর্মটি কোরবানির পশুর জন্য দেশের সবচেয়ে বড় ম্যাচ মেকিং ডিজিটাল হাট হতে যাচ্ছে। খামারি ও চাষিদের অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে বাঁচাতে এবং সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই এমন উদ্যোগ। সারা দেশের খামারি ও চাষিদের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, তারা যেন তাদের পশুর তথ্য নিয়ে এই প্লাটফর্মে আসেন। দেশের সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষা অটুট রেখেই অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডগুলো চালিয়ে যেতে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।’
জানা গেছে, বাংলাদেশে আসন্ন ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে গ্রাহকদের জন্য পশু কেনাবেচার সুযোগ করে দিচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ই-কমার্স সাইটের মাধ্যমে এ সুযোগ পাওয়া যাবে। ফলে অনলাইনে বুকিং দিয়ে কিছু অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করলে নির্দিষ্ট সময় বাড়িতে গরু পৌঁছে দেবে বিক্রেতা বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে কোনো কোনো কোম্পানি সরাসরি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে শুধু গরু কেনাবেচার বিজ্ঞাপন থাকবে।
কেনাবেচার প্রক্রিয়ায় শুধু বিক্রেতা ও ক্রেতা থাকেন। আবার গোয়াল থেকেই কাক্সিক্ষত মূল্যে পালিত পশু বিক্রি করতে পারছেন চাষি ও খামারিরা। ক্লাসিফায়েড অনলাইন ও ই-কমার্স সাইটগুলোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও বিভিন্ন গ্রুপ এবং পেজ খুলে চলছে কোরবানির পশু বিক্রি। এসব সাইটে আছে পশুর সব রকমের তথ্য। আছে পশুর জাত, বয়স ও ওজন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য। এর পাশাপাশি খাদ্যতালিকা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সংবলিত বিস্তারিত তথ্যও থাকছে। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, ইতোমধ্যে সারা দেশ থেকে বিক্রেতারা নিবন্ধিত হতে শুরু করেছেন। গতকাল পর্যন্ত ৩০৬ খামারি, ২৭৪ স্বতন্ত্র বিক্রেতা, ৬৬ বেপারি ও তিনজন কসাই নিবন্ধন করেছেন।
রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. মুনির উজ্জামান বলেন, ‘কোরবানির এ সময় হাটে-ঘাটে-মাঠে থাকে যানজট আর জনজট। সঙ্গে থাকে দালালের খপ্পর, ছিনতাইয়ের ভয়, জাল টাকা ইত্যাদি নানা ঝক্কি-ঝামেলা। তা ছাড়া এবার করোনা মহামারীতে কোরবানির হাটে নিজে গিয়ে দেখেশুনে কোরবানির পশু কেনা খুবই চ্যালেঞ্জিং। এসব ঝুঁকি এড়াতে এবার ভাবছি ভার্চুয়াল কোরবানির হাটের মাধ্যমে গরু কিনব।’
গুলশানের বাসিন্দা মো. জারিফ আহমেদ পেশায় চাকরিজীবী। তিনি বলেন, ‘এবার কোরবানির ঈদে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পশু কেনাবেচার সুযোগ করে দিচ্ছে। তা ছাড়া ক্লাসিফায়েড অনলাইন ও ই-কমার্স সাইটগুলোর পাশাপাশি ফেসবুকেও দেখলাম বিভিন্ন গ্রুপ এবং পেজ খোলা হয়েছে। এমনকি পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাইয়ের পর মাংস বানিয়ে পর্যন্ত নাকি দেবে তারা। প্রযুক্তির কারণে এসব কঠিন কাজ কত সহজ হয়ে গেছে। অনলাইনে শুধু গরু নয়, কসাইও মিলছে! সত্যি সত্যি যদি এমনটা হয়, তাহলে আর এত কষ্ট করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হাটে যাব কেন?’
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মার্কেট প্লেস ও অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচার অন্যতম মাধ্যম ‘বিক্রয় ডটকম’, ‘কোরবানি ডট বেঙ্গলমিট ডটকম’ এবং ‘দারাজ ডটকম’। বিক্রয় ডটকমের হেড অব মার্কেট প্লেস নাজ হুসাইন বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে ঈদুল আজহায় আমরা গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পেয়ে এ বছর আরো বেশিসংখ্যক কোরবানির পশু নিয়ে হাজির হচ্ছি। করোনা মহামারীতে এবার ক্রেতারা নিজেদের নিরাপদ রাখতে কোরবানির পশু কেনায় অনলাইন মার্কেটের ওপরই বেশি ভরসা করবেন- এমনটাই আমাদের বিশ্বাস।’
এদিকে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন কোরবানির অঙ্গীকার নিয়ে বেঙ্গলমিট টানা পঞ্চমবারের মতো আয়োজন করেছে অনলাইন কোরবানির হাট য়ঁৎনধহর.নবহমধষসবধঃ.পড়স. তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোরবানির পশু কেনার পাশাপাশি গ্রাহকরা পাচ্ছেন ‘পরিপূর্ণ কোরবানি সেবা’। এর মাধ্যমে তারা পাবেন বিশ্বমানের নিরাপদ খাদ্য নীতিমালা অনুযায়ী মাংস প্রসেসিং ও হোম ডেলিভারির সুবিধা। এ অনলাইন সাইটটি একটি সাধারণ শপিং সাইটের মতোই কাজ করে।
ফলে ক্রেতারা এ ওয়েবসাইটটি সাবলীলভাবে ও সহজে অপারেট করতে পারবে বলে জানান সাইটটির একজন বিক্রয়কর্মী। ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম হওয়ায় এ ওয়েবসাইটে কোরবানির পশুবিষয়ক প্রয়োজনীয় সব তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানা গেছে। তা ছাড়া পেজটিতে ক্রেতারা পাবেন কোরবানির পশু বাছাইয়ের পাশাপাশি পশু কেনার সহজ নিয়মাবলিও।
অপরদিকে কোরবানির পশু বেচাকেনায় ফেসবুকে ৩০ হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে ‘গরু-ছাগলের বিরাট হাট’ নামে সম্প্রতি একটি গ্রুপ করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক খামারি এবং সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতারা পোস্ট করছেন কোরবানির পশু এবং কোরবানি-সংক্রান্ত নানা তথ্য। অনেক বিক্রেতা নিজেদের গবাদিপশুটি বিক্রির জন্য এ গ্রুপে পোস্ট করেন বলে জানা গেছে।
খবর সারাবেলা / ১২ জুলাই ২০২০ / এমএম




