কোথাও নেই স্বাস্থ্যবিধি

October 21, 2020

মঙ্গলবার দুপুর ১২ টা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার বাস স্টপেজে একের পর এক থামছে বাস। বাস থামা মাত্রই তাতে ওঠতে হুড়োহুড়ি করছেন যাত্রীরা। তবে তাদের অনেকের মুখে ছিল না মাস্ক।এমনকি অনেক বাসের ড্রাইভার ও হেলপারের মুখেও ছিল না মাস্ক। ‘সামাজিক দূরত্ব’ মানতেও দেখা যায়নি যাত্রীদের কাউকেই। শুধু বাসস্টপেজ নয়, এমন চিত্র এখন হাঠ-বাজার, লঞ্চ টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, পার্কসহ দেশের সর্বত্রই।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থান সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও নেই স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ঢাকাসহ সারাদেশে গত মার্চে অঘোষিতভাবে লকডাউনে যায় সরকার। তবে জীবন-জীবিকা সচল এবং অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে জুন থেকে এ কঠোরতায় শিথিলতা আনা হয়। করোনা সংক্রমণের মাঝেও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরে দেশ। করোনার সংক্রমণ না কমলেও মানুষের মাঝে কমতে শুরু করে আতঙ্ক।

দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও এখনো বিপদ কাটেনি। সরকার ও বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে করোনার ‘দ্বিতীয় ঢেউয়ের’। তাদের পক্ষ থেকেই সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে বলা হচ্ছে। তবে জনগণ হেলাফেলা করায় ফের স্বাস্থ্যবিধি মানতে কঠোর হওয়ার দিকেই যাচ্ছে সরকার।

গত সোমবার মন্ত্রিসভার যে বৈঠক হয়, সেখানে কোভিড-১৯ নিয়ে অনির্ধারিত এক আলোচনায় মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করাসহ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাব্য ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ মোকাবিলায় ঘরের বাইরে সবার মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে নয়, জনসচেতনতায় মসজিদ থেকে মাস্ক ব্যবহারে মাইকিং করা এবং বাজার, মার্কেট ও জনসমাগমস্থলে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করার কথা বলেছে মন্ত্রিসভা।

রাজধানীসহ দেশের মানুষের জীবনযাত্রার চেহারা দেখলে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নাই যে এখন বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতির দিকে আছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের হাট-বাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, দোকানপাট, রাস্তাঘাট, লঞ্চ-স্টিমার, ট্রেনে মানুষের সমাগম ফিরেছে আগের চেহারায়। পাড়া-মহল্লায় চায়ের দোকানগুলোয় মধ্যরাত পর্যন্ত চলে আড্ডা। আগের মতোই স্টেশনগুলোর চায়ের দোকান, হোটেল চলে সারা রাত।

গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, করোনার কারণে স্থবির হয়ে যাওয়া রাজধানীতে চেহারা পুরোটাই ফিরেছে আগের জায়গায়। শুরু হয়েছে রাজধানীর ফুটপাত জুড়ে হকারদের রমরমা ব্যবসা। রাজপথে এখন নিয়মিত যানজট। বাস, লঞ্চ, স্টিমারসহ গণপরিবহন চালানোর ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব মানার শর্ত থাকলেও এখন আর তা মানা হচ্ছে না। কোনো গণপরিবহনেই রাখা হয় না হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

গতকাল দুপরে কারওয়ান বাজার থেকে আব্দুল্লাপুর গামী এয়ারপোর্ট স্পেশাল এক্সপ্রেসের বাসে দেখা যায় ১৮ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র ৬ জনের মুখে রয়েছে মাস্ক। আবার দু’একজন মাস্ক মুখে না পরে কানে ঝুলিয়ে রেখেছেন। রহিম মিয়া নামে এক যাত্রী বলেন, ‘সারা দিনই বাইরে থাকতে হয়। সব সময় মাস্ক মুখে রাখতে ভালো লাগে না। এ কারণে বাসে উঠে একটু খুলে রাখলাম।’

মুখে মাস্ক কেনো ব্যবহার করছেন না- এ প্রশ্ন করা হলে অনেকেই জবাবে বলেন, ‘ভাইরাস খাইতে খাইতে হজম হইয়া গেছে। রাত-দিন বাসের মইধ্যে থাকি। শত শত মানুষের সঙ্গে উঠাবসা। মাস্ক পইরা আর কি অনব’।

এদিকে রাজধানীর মহল্লায় দোকানপাট বা কাঁচাবাজারের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটগুলো এখন পুরোপুরি খুলেছে। রাত ১০-১১টার মধ্যে রাজধানীর পাড়া-মহল্লা আগের মতই সরগরম হয়ে ওঠে। রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোয় ভিড় বাড়তে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই।

কাঁচাবাজারের মাছ বা সবজির অনেক দোকান এবং স্টল পুরোটাই পূর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু সেসব স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি। পান্থপথ সিগনালে ফুটপাতের চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন ৪ বন্ধু। তাদের কারো মুখে নেই মাস্ক। মাস্ক পরছেন না কেনো জানতে চাইলে তারা জবাবে বলেন, আমরা নিজেরাই বসে আছি। তাই মাস্ক পরছি না।

ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা থেকে অফিসের কাজ করার পদ্ধতিও (রোস্টার প্রথা) বাতিল করে দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ভার্চুয়াল কিংবা শারীরিক উপস্থিতিতে মামলার শুনানিতে বিচারপতি এবং আইনজীবীরা বসতে শুরু করেছেন।

সরকারি অফিস-আদালতের বাইরে বেসরকারি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট হাউসগুলোর অনেকেই এখন চলছে পুরনো নিয়মে। সেখানেও শতভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেই ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। মন্ত্রীরাও এখন অফিসিয়াল কাজকর্ম বা মিটিং অনলাইন বা জুম ব্যবহারের পাশাপাশি সরাসরি নিজ দফতরে করতে শুরু করেছেন।

খবর সারাবেলা / ২১ অক্টোবর ২০২০ / এমএম