করোনায় শহর-গ্রাম একাকার
দেশে করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখা দিয়েছে। ভয়ঙ্কর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ব্যাপক সামাজিক সংক্রমণের কারণে প্রতিদিনই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে সবখানে বাড়ছে রোগীর চাপ। দেশের অন্তত ২০টি হাসপাতালে ইতোমধ্যেই দেখা দিয়েছে আইসিইউ শয্যা সংকট।এই চাপ অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় চিকিৎসা নিশ্চিতে রাজধানীতে দ্রæততম সময়ের মধ্যে বড় আকারের ৫টি ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর বাইরে বিভাগীয় ও জেলা শহরে নতুন করে করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি
হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা, আইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগ। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বঙ্গমাতা কনভেনশন সেন্টারে ১২০০ শয্যার ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বাকি ৪টি স্থান অল্প সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত করতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সংকট সমাধানে চার হাজার নতুন ডাক্তার ও ৪ হাজার নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
শনিবার দুপুরে বিএসএমএমইউর কনভেশন সেন্টার পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শুক্রবার সারা দিন ঘুরে দেখেছেন রাজধানীর কোন কোন স্থানে ফিল্ড হাসপাতাল করা যায়। এরমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভেশন সেন্টারে আমরা ১০০০ থেকে ১২০০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুততম সময়ের মধ্যেই করতে পারব। এই হাসপাতালটি আমি মনে করি বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে তৈরি হবে। এটি ফাইভ স্টার স্ট্যান্ডার্ড বিল্ডিং। এখানে হাসপাতালে সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলেই হবে। সব সুযোগ-সুবিধা এখানে থাকবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক আমাদের চেষ্টা থাকবে যত দ্রæত সম্ভব হাসপাতালটি চালু করা। ফিল্ড হাসপাতালে চার শতাধিক আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। আরো চারশ বেডের আইসিইউ সমতুল্য এসডিইউ (স্টেপ ডাউন ইউনিট) স্থাপন করা হবে। বাকি শয্যাগুলোতেও অক্সিজেনের সুব্যবস্থা থাকবে।’
সারা দেশে রোগীর চাপ বেড়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাইরের রোগী এখন ঢাকাতে চলে আসছে। সেকারণে ঢাকাতে চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, রংপুরসহ প্রায় প্রতিটি বিভাগে করোনা রোগীর চাপ বেড়েছে। এজন্য জেলা পর্যায়ে নতুন করে করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংকট সামলাতে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আড়াই হাজার কনসেনট্রেটেড অক্সিজেন সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। দেয়া হয়েছে ১৮শ হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানুলা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন, শুধু শয্যা বাড়ালেই চলবে না, সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া হাসপাতালের বেড বাড়ানোর একটা সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা তো গোটা দেশকে হাসপাতাল বানাতে পারব না। আর সব জায়গায় হাসপাতাল স্থাপনের জায়গাও পাব না। হাসপাতালে শুধু শয্যা বাড়ালেই হবে না, প্রশিক্ষিত জনবলও নিয়োগ দিতে হবে।’
উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না বলেই সংক্রমণ কমছে না। মানুষ মাস্ক পরে না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে না। করোনা রোগী বেড়েছে ৮ গুন। ফুসফুস ৭০ ভাগ সংক্রমিত হয়ে যাওয়ার পর রোগীরা হাসপাতালে আসছে। এমতাবস্থায় তাদের চিকিৎসা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’
গত জুন মাসের শুরুতেই দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে আঘাত আনে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। স্বাস্থ্য অধিদফতরের খামখেয়ালিপনায় তা দ্রুতই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। এরপর থেকেই দেশজুড়ে দেখা দেয় করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি।
বতর্মানে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে খুলনা বিভাগ। দেশজুড়ে একই সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। সব হাসপাতালেই বেড়েছে রোগীর চাপ। দেখা দিয়েছে অক্সিজেন, আইসিইউ ও শয্যা সংকট। অধিকাংশ হাসপাতালে অতিরিক্ত শয্যা কিংবা করোনা ইউনিট বর্ধিত করেও ক‚লকিনারা পাওয়া যাচ্ছে না।
খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরই বলছে, সারা দেশে করোনা চিকিৎসার জন্য ১৫ থেকে ১৬ হাজার শয্যা রয়েছে। যার ৮০ শতাংশই ইতোমধ্যে রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সব জায়গায় শষ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে করোনার প্রকোপ ছিল রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জসহ বড় শহরগুলোতে। কিন্তু ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট আঘাত হানার পর তা ছড়িয়ে গেছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। হাসপাতালে আসা রোগীদের ৫০ শতাংশই গ্রামের রোগী বলে ইতোমধ্যেই জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। মারাও যাচ্ছে বেশি গ্রামের রোগীরাই। কারণ গ্রামের রোগীরা করোনা চিকিৎসায় অসচেতন।
করোনার উপসর্গকে সাধারণ রোগ মনে করে এর সঠিক চিকিৎসা নিতে আসেন না হাসপাতালে। অনেক সুযোগ থাকার পরও করোনা টেস্ট করান না। আবার অনেকে টেস্ট করানোর সুযোগও পান না। করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর যখন চিকিৎসা নিতে আসেন তখন অধিকাংশ রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়। যার ফলে চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও তাদের বাঁচাতে পারেন না।
অব্যাহতভাবে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে দাবি করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিতে ফিল্ড হাসপাতালের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে জনবহুল ও বিভাগীয় শহরগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে জানান তারা।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে জায়গা হবে না এটা তো বুঝাই যাচ্ছে তাই না? এখনই আমরা বিকল্প চিন্তা করতে পারি। বিভাগীয় শহরে আমরা ফিল্ড হাসপাতাল করতে পারি। কারণ রাতারাতি চাইলেই তো স্বাস্থ্য খাতের অনেক কিছু করা সম্ভব না। যাদের সংক্রমণের মাত্রা খুবই কম তাদের কিন্তু আমরা ফিল্ড হাসপাপতালেই চিকিৎসা দিতে পারব।
তিনি বলেন, এতে অনেক মানুষকে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। কিন্তু অবশ্যই এখানে বেশ গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যাপ্ত লোক, ডাক্তার, নার্স ও অক্সিজেনসহ অন্যান্য মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট থাকতে হবে। যদিও যাদের অক্সিজেন দরকার পড়ে না, আমরা তাদের ফিল্ড হাসপাতালে রাখব। কিন্তু দরকার পড়লে যেন বিপদে পড়তে না হয় সে জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা আমরা করব।
রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান উপদেষ্টা ড. মোশতাক হোসেন বলেন, রোগীদের চিকিৎসা ও আইসোলেশন নিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে। বন্ধ হাসপাতালগুলো চালু করার সিদ্ধান্ত দেয়া হলেও সেটি কার্যকর হতে দেরি হচ্ছে। তবে ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে জনবহুল এলাকায়। এমন কোনো স্থানে হাসপাতাল স্থাপন করা যাবে না, যেখানে জনসাধারণের পক্ষে যাওয়া-আসা দুরূহ।
খবর সারাবেলা / ১১ জুলাই ২০২১ / এমএম




