করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু

চলতি মাসের শুরুর দিন থেকেই দেশে ফের বাড়তে শুরু করেছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। রাজধানীর হাসপাতাল গুলোর আইসিইউতে জটিল রোগীর সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিগত ৫৬ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। তবে গতকাল শুক্রবার পরীক্ষার সংখ্যা কমায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় ছিল কম।

করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কেন বাড়ছে- তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছেন বিশেষজ্ঞরাও। তারা বলেছেন, চলতি মাসে এসে করোনা সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে। আগামী দুই সপ্তাহ এ গতিতে চলতে থাকলে নিশ্চিত হওয়া যাবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হচ্ছে কি না।

এরই মধ্যে ইউরোপের দেশগুলোসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে। পরিস্থিতি সামলাতে কয়েকটি দেশ নতুন করে লকডাউনও ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন অবস্থায় বাংলাদেশের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশেও কিছুদিন সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা কমের দিকে থাকার পর এখন আবার বাড়ছে। তাই সংক্রমণ প্রতিরোধে মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা না গেলে আবারো লকডাউন দেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, ১ নভেম্বরে রোগী শনাক্ত হয় এক হাজার ৫৬৮ জন, ২ নভেম্বর এক হাজার ৭৩৬ জন, ৩ নভেম্বর এক হাজার ৬৫৯ জন, ৪ নভেম্বর এক হাজার ৫১৭ জন আর ৫ নভেম্বর এক হাজার ৮৪২ জন। গত ৫৬ দিনের মধ্যে একদিনে শনাক্ত হওয়া রোগীর মধ্যে এটি সর্বোচ্চ। গতকাল ৬ নভেম্বর রোগী শনাক্ত করা হয়েছে এক হাজার ৪৬৯ জন। তবে ওইদিন আগের দিনের তুলনায় একহাজার ৭০৪টি নমুনা কম পরীক্ষা করা হওয়ায় শনাক্তের সংখ্যা কিছুটা কম বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলেছেন, দেশে এখন প্রতিদিন দেড় হাজারের করোনা রোগী শনাক্ত এবং আনুমানিক ২০-৩০ জন করে মারা যাচ্ছে। অথচ করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও সচেতনতা নেই। সংক্রমণের প্রথম দিকে এই ভাইরাস নিয়ে মানুষ অনেক সচেতন ও ভয়ে থাকলেও এখন সেটি কমে গেছে। মানুষ প্রয়োজন ছাড়াই হাটে-বাজারে যাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে, চা-সিগারেট খাচ্ছে। অনেককে পরতে দেখা যাচ্ছে না মাস্ক।

গণপরিবহনসহ বিপণিবিতান বা মার্কেটগুলোয় মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। কমে গেছে কিছুক্ষণ পরপর সাবান দিয়ে এক মিনিট ধরে হাত ধোয়ার প্রবণতা। কমেছে উপসর্গ থাকলে টেস্ট করানো ও পজিটিভ শনাক্ত হলে আইসোলেশনে থাকাসহ অন্যান্য সতর্কতামূলক বিষয়গুলোও।

৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। শুরুতে করোনার সংক্রমণ কমের দিকে থাকলেও মের মাঝামাঝি থেকে করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে থাকে। সে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই রোগী শনাক্তের হার চলে যায় ২০ শতাংশের ওপরে। চলতে থাকে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। তবে তারপর থেকে শনাক্তের হার কমতে থাকে। প্রায় এক মাসের বেশি সময় থেকেই শনাক্তের হার ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে গত ২ নভেম্বর রোগী শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশে। গত ২৬ অক্টোবর দেশে করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যা চার লাখ ছাড়িয়েছে।

বর্তমানে রোগী শনাক্তের ৪৫তম সপ্তাহ চলছে। গত ১ নভেম্বর শনাক্তের ৪৪তম সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, করোনা শনাক্তের ৪৩তম সপ্তাহের চেয়ে ৪৪তম সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষা, শনাক্ত ও সুস্থতার হার কমেছে, বেড়েছে মৃত্যুহার।

৪৩তম সপ্তাহে করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৯৪ হাজার ৭৮৪টি আর ৪৪তম সপ্তাহে পরীক্ষা হয়েছে ৮৯ হাজার ৭৭৬টি। আগের সপ্তাহের চেয়ে পরের সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষার হার পাঁচ দশমিক ২৮ শতাংশ কমেছে। ৪৩তম সপ্তাহে করোনাতে শনাক্ত হয়েছে এক হাজার ২১২ জন। আর ৪৪তম সপ্তাহে শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ১৭৭ জন। এখানেও রোগী শনাক্তের হার আগের সপ্তাহের চেয়ে শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে।

অপরদিকে ৪৩তম সপ্তাহে সুস্থ হয়েছেন ১১ হাজার ২৬৫ জন আর ৪৪তম সপ্তাহে সুস্থ হয়েছেন ১০ হাজার ৫৮২ জন। ৪৩তম সপ্তাহের চেয়ে ৪৪তম সপ্তাহে সুস্থতার হার কমেছে ছয় দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। একইসঙ্গে ৪৩তম সপ্তাহে মারা গেছেন ১৩৪ জন আর ৪৪তম সপ্তাহে মারা গেছেন ১৪৩ জন। ৪৩তম সপ্তাহের চেয়ে ৪৪তম সপ্তাহে মৃত্যু হার বেড়েছে ছয় দশমিক ৭২ শতাংশ।

এদিকে গত ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা আবার বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করে জানিয়েছেন, ‘এখনো করোনা ভাইরাসের প্রভাব আছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে আরেকবার হয়ত এই করোনা ভাইরাসের প্রভাব বা প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। কারণ ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আবার নতুন করে দেখা দিচ্ছে। আমাদের এখন থেকেই সবাইকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। আর এ আশঙ্কা সামনে রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসহ ২২টি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভাগকে আগাম প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইতোমধ্যে দেশে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি ঘোষণা করে জানিয়ে দিয়েছে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, রোগী একটু বাড়তে শুরু করেছে। মাস্ক পরাসহ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলেই যাচ্ছি। কিন্তু কেউ শোনে না। যার কারণে রোগী বাড়ছে।

চলতি মাসের শুরু থেকে রোগী বাড়ছে শীতের কারণে নাকি মানুষের স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে জানতে চাইলে ডা. নজরুল বলেন, ‘এটা আরো সপ্তাহ দুয়েক না দেখলে বোঝা যাবে না। আগামী দুই সপ্তাহ এ গতিতে চলতে থাকলে আমরা বলতে পারব বোধ হয় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হচ্ছে।

মহামারী বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এই মুহূর্তে সবাই রিলাক্স হয়ে গেছে। কেউ স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করছে না। এ কারণে সংক্রমণ বাড়ছে।’

চলতি সপ্তাহে রোগী সংক্রমণের হার ‘একটু বেড়েছে’ মন্তব্য করে ডা. মুশতাক বলেন, তবে এটাকে এখনো ‘উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি’ বলা যায় না।

ঢাকার আইসিইউতে করোনা রোগী বাড়ছে: রাজধানী ঢাকার হাসপাতালগুলোতে জটিল রোগীর সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। শূন্য শয্যার চেয়ে রোগী ভর্তি শয্যার সংখ্যা বাড়ছে। তবে রাজধানী বাদে সারাদেশের আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র)-তে ফাঁকা শয্যা বেশি। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া যায়।

সংক্রমণের মাঝের সময় জুন-জুলাই এর দিকে আইসিইউ না পেয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও গণমাধ্যমে এসেছে। তারপর থেকে সংক্রমণের হার কমার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের আইসিইউ শয্যা এবং সাধারণ শয্যা ফাঁকা থাকা শুরু হয়। শয্যা ফাঁকা থাকাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনেকগুলো করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল কমিয়ে আনে। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানী ঢাকার হাসপাতালগুলোতে আইসিইউতে রোগীর সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গতকালের বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, রাজধানীতে মোট ৩১৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে রোগী আছেন ১৯১ জন, আর ফাঁকা রয়েছে ১২৩টি বেড। তবে সারাদেশে করোনা রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) রয়েছে ৫৬৪টি। এর মধ্যে রোগী আছেন ১৭৩ জন, আর ফাঁকা রয়েছে ২৯১টি বেড।

খবর সারাবেলা / ০৭ নভেম্বর ২০২০ / এমএম