স্বাস্থ্যবিধি না মানলে বিপর্যয়ের শঙ্কা

প্রাণঘাতী করোনার ভাইরাসের সংক্রমণের দিক দিয়ে উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সঙ্গে দ্রুতগতিতে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই পূর্বের রেকর্ড ভেঙে আক্রান্ত ও মৃত্যুর নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরো দুই হাজার ৫২৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এটিই এ পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ৪২ হাজার ৮৪৪ জন করোনা শনাক্ত হলেন। আর এ নিয়ে করোনায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮২ জনে।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে শিথিল করা হয়েছে অঘোষিত লকডাউনকে। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সাধারণ ছুটি আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে আগামীকাল রোববার থেকে খুলবে সরকারি-বেসরকারি অফিস। শর্তসাপেক্ষে চলাচল শুরু হবে অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান, বাস, ট্রেন, ল ।

তবে সোমবার থেকে চলবে বাস। ১৫ জুন পর্যন্ত সীমিত পরিসরে অফিস খোলা রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে করতে চায় সরকার। এ সময়ে সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

এদিকে সাধারণ ছুটি না বাড়ানোর কারণে সরকারের এ সিদ্ধান্ত নেয়ায় বিভিন্ন মহলে দেখা দিয়েছে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জনিয়েছেন, সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। কেউ কেউ বলছেন অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এগুলো খুলে দেয়ার বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া দেশের সব কিছু যখন স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তখন দেখা যাচ্ছে রেকর্ডসংখ্যক নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। সংক্রমণের হার দ্রুত বেগে বাড়ছে।

কোভিড হাসপাতালগুলো ইতোমধ্যেই তার সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। কোনো নতুন কোভিড রোগীকে তারা জায়গা দিতে পারছেন না। দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে গেছে করোনা ভাইরাস। তারা বলেন, এখনো সবকিছু উন্মুক্ত করে দেয়ার মতো পরিস্থিতি আসেনি। বরং সাধারণ ছুটি বা লকডাউনকে আরো কঠোর করা উচিত। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। সংক্রমণ আরো বেশি জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে।

দেশবরেণ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্যরা জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হলে সংক্রমণের হার বাড়ার আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যকে হুমকিতে ফেলবে। গত বৃহস্পতিবার সকালেই বৈঠক শেষে পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা স্বাক্ষরিত এক বার্তায় বলা হয় যে, কোভিড-১৯ একটি সংক্রামক রোগ, যা হাঁচি-কাশি ও সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। জনসমাগম এ রোগের বিস্তারের জন্য সহায়ক। পৃথিবীর অন্য দেশের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এই রোগ সংক্রমণের হার সুনির্দিষ্টভাবে না কমার আগে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চালু করলে রোগের হার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু হলে করোনা ভাইরাস ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়বে। কারণ সরকার জনগণের স্বার্থে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টা করছে। সরকার জনগণকে কিছু গাইডলাইন দিয়েছে। এখন জনগণকে সেই জায়গায় সাড়া দিতে হবে। জনগণ যদি গাইডলাইন মেনে না চলে তাহলে পুরো সিচ্যুয়েশন পাল্টে যাবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) মানবকণ্ঠকে বলেন, এক কথায় দেশ এক মারাত্মাক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। করোনার এই উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে লকডাউন, সাধারণ ছুটি না বাড়িয়ে সরকারি-বেসকারি অফিস ও গণপরিবহন চালু করায় আমি মনে করি, বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের একটি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান জানান, দেশে এখন করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। যদিও দেশের প্রকৃত চিত্র এখনো দৃশ্যমান নয়। ঈদে অনেক মানুষ ভ্রমণ করেছেন। এতে সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। এক্ষেত্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালনের কোনো বিকল্প নেই। নয়তো বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

জাতীয় করিগরি পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান জানান, সংক্রমণ যখন নিুমুখী হয় এবং ৫০ শতাংশ কমে আসে এবং দুই সপ্তাহ ওই অবস্থায় থেকে যায়, তখন লকডাউন সংক্রান্ত আরোপিত বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল করা যেতে পারে। তবে এর আগে লকডাউন শিথিল কোনোভাবেই কাম্য নয়।

তিনি বলেন, ঈদপরবর্তী সময়ে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে দেখা যাবে, সংক্রমণের গতি পূর্বের তুলানয় ঊর্ধ্বমুখী। তাই এ সময়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

অধ্যাপক ইকবাল বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির আলোকে জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তায় করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করব। এক্ষেত্রে জনগণের প্রতি অনুরোধ, নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করোনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে চলুন। সবকিছু খুলে দেওয়ার ফলে করোনা পরিস্থিতিতে তিন ধরনের সংকট দেখা দেবে বলে মনে করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আ লিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও টেকনিক্যাল পারসন হিসেবে আমাদের কথা হলো সরকারের এ সিদ্ধান্ত একটা চরম ভুল। কারণ সংক্রমণ কীভাবে বাড়ছে, সেটা সবাই দেখছে। পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যে হারে সংক্রমণ বাড়ছে, সেটা খুবই উদ্বেগের। আবার বাড়ার যে সংখ্যা, সেটা প্রকৃত সংখ্যা নয়।

যাদের টেস্ট করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে থেকে শনাক্ত সংখ্যা। টেস্টের আওতা বাড়িয়ে দিলে সংক্রমণের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। সেটা যদি দেশব্যাপী হয়, তাহলে আরও বেড়ে যাবে। সেজন্য সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে এ সংক্রমণের মাত্রাটা আরও বাড়াবে। দ্রুত বাড়াবে।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা লকডাউন শিথিলের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছে, যেটা সব দেশের জন্য প্রযোজ্য। তারা বলেছে, প্রত্যেক দেশেরই একটা লকডাউন এক্সিট প্ল্যান (লকডাউন থেকে বেরোনোর পরিকল্পনা) থাকবে। তার মানে হলো লকডাউন ওঠাতে হলে একটা পরিকল্পনা থাকতে হবে। এটা তখন থেকেই হবে যখন থেকে সংক্রমণ কমবে। আমাদের এখানে তো সংক্রমণ কমেইনি। আরো বাড়ছে। ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মানা হলো না। তাদের পরামর্শ না মেনে সিদ্ধান্ত দেওয়াটা আরেকটা ভুল হলো।

এদিকে জানা গেছে, যাত্রীদের অবশ্যই মাস্ক পরিধান করে বাসে উঠতে হবে। আর পরিবহন মালিকেরা চালক ও সহকারীদের মাস্ক সরবরাহ করবে। বাস ছাড়ার আগে জীবানুমুক্ত করতে হবে। আর এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করবে বিআরটিএ, পুলিশ ও মালিকশ্রমিক সংগঠন। এ জন্য ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে তিনটি কমিটি গঠন করা হবে। বাসে ৫০ শতাংশ আসন ফাঁকা রাখা হলে পরিবহন মালিকদের লোকসান গুণতে হবে এমন দাবি করে ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তুলেন তারা। তবে বৈঠকে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে বিআরটিএর একটি স্থায়ী ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি আছে।

আজ শনিবার ওই কমিটি বৈঠকে বসে ভাড়ার বিষয়ে আলোচনা করবে। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে একজেলা থেকে অন্য জেলায় চলাচল নিষেধ। এ অবস্থায় দূরপাল্লার বাস কীভাবে চলবে? এই বিষয়ে সবাই একমত হন যে দূরপাল্লার বাসগুলো পথে কোথাও যাত্রী তুলবে না। তবে কেউ নামতে চাইলে নামানো হবে।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খোন্দকার এনায়েত উল্যাহ গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশ ও বিআরটিএর সহায়তায় তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, অর্ধেক আসন ফাঁকা রাখা হবে। তাই ভাড়া বৃদ্ধির দাবি তাদের ছিল। আজ এই বিষয়ে বৈঠক হবে।

খবর সারাবেলা / ৩০ মে এপ্রিল ২০২০ / এমএম