টিকা আনতে অগ্রিম ৬০০ কোটি টাকা
বৈশ্বিক মহামারী করোনার হাত থেকে রক্ষা পেতে টিকার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত টিকার অনুমোদন দিয়েছে ভারতের সরকার।
ফলে টিকার ভারতের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে যতসম্ভব তাড়াতাড়ি টিকা আনার ব্যাপারে তৎপরতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। সেরাম ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং সরকারের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী টিকা আনতে সরকার আজ রবিবার সেরাম ইনস্টিটিউটকে অগ্রিম ৬০০ কোটি টাকা দেবে বলে জানা গেছে।
এদিকে ভারত সরকার গতকাল শনিবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকার বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত টিকার যে অনুমোদন দিয়েছে এই অনুমোদনসহ অন্যান্য বিষয়গুলোর সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে টিকার প্রথম চালান বাংলাদেশে আসবে বলে আশা করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গত বছর এক অনুষ্ঠানে জানুয়ারিতে দেশে টিকা আসবে বলে আভাস দিয়েছিলেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে ৬ মাসের মধ্যে সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশকে দেবে ৩ কোটি ডোজ টিকা। যা দিয়ে প্রতি মাসে ২৫ লাখ মানুষকে করোনার ভ্যাকসিন দেয়া হবে। প্রতি জনের জন্য দুটি করে ডোজ দরকার হবে। দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হবে প্রথম ডোজের ২৮ দিন পর। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যারা টিকা পাবেন তাদের একটা প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, ভারতের টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট অগ্রিম ৬০০ কোটি টাকা নেবে। বাকি টাকা টিকা সরবরাহ শুরু করার পর দেয়া হবে। চুক্তির ধারা অনুযায়ী তারা যদি আগামী জুনের মধ্যে টিকা দিতে না পারে তাহলে অগ্রিম টাকা বাংলাদেশকে ফেরত দেবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, যে কোনো টিকার দুটি দিক রয়েছে। একটা টিকা দেশে আনা এবং দ্বিতীয় হলো ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। এটার ব্যাপারে আইনি অনেক বাধ্যবাধকতা আছে, অনেক রকম আইন আছে। এটা যাতে সরাসরি ক্রয় করা যায় সেজন্য প্রধানমন্ত্রী আমাদের অনুমোদন দিয়েছেন।
মহাপরিচালক বলেন, টিকা আনার পর সংরক্ষণের জন্য কোল্ড চেইন মেইনটেইন করতে হবে। সেজন্য বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে চুক্তি করেছে অধিদফতর। বেক্সিমকোর জেলা পর্যায়ে যেসব ডিপো রয়েছে কোল্ড চেইন মেইনটেইন করার যেসব জায়গায় সক্ষমতা আছে সেই জায়গাগুলোতে পৌঁছে দেয়া হবে।
তিনি বলেন, টিকা দেয়ার জন্য সারা দেশে ২৬ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী এবং সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক কাজ করবেন। তার পরও আমাদের বলা হয়েছে যেগুলো অফিসিয়াল প্রসিডিউর আছে সেগুলো মেইনটেইন করতে। আমরা সেগুলো করব। আইনে যা আছে সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করব। এজন্য ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি এবং অনুমোদন অবশ্যই লাগবে, আমরা সে ব্যবস্থাও করব।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিইও) রাব্বুর রেজা বলেন, টিকা ভারত থেকে আনার পর কোল্ড চেইন টঙ্গীতে তাদের দুটি ওয়্যারহাউসে নেয়া হবে। এরপর সরকার অনুমোদিত ওয়্যারহাউসগুলোতে পৌঁছে দেয়া হবে। ডেলিভারির মধ্য দিয়ে বেক্সিমকোর দায়িত্ব শেষ হবে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট তো আগে থেকেই ভ্যাকসিন তৈরি করে রেখেছে। ভারত যে অনুমোদন দিল, সেটাকে বলে লিমিটেড পারমিশন। মানে কোনো দেশ যখন দেয়, তখন সেটা হয় লিমিটেড পারমিশন।
আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বা এফডিএ যখন দেয়, তখন বলা হয় পারমিশন। তবে, এক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় আছে। ইউরোপের সাতটি দেশ রয়েছে, যেই দেশগুলোতে অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ গ্রহণ করে থাকে। সেই বিবেচনায় যুক্তরাজ্য যেহেতু অনুমোদন দিয়েছে, তাই বাংলাদেশও সেটা বিবেচনা করতে পারে। আর ভারত থেকে ভ্যাকসিন আসতে এখন আর তো কোনো বাধা নেই।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে যারা ভ্যাকসিন আনবে, তারা আবেদন করলে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন বলে মনে করেন আইইডিসিআরের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘ভারতে অনুমোদন পাওয়ার কথা শুনেছি। কিন্তু, আমাদের নীতিমালা হলো, ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন বা সাতটি উন্নত দেশ আছে, তাদের যে কোনো দুটি দেশ অনুমোদন দিলে আমরা সেটার কাগজপত্র নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের এখানেও অনুমোদন দিতে পারি। এর জন্য কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন হবে না।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কারা পাবে টিকা: এদিকে দেশে প্রাথমিকভাবে ২০ শতাংশ যারা টিকা নেবেন তাদের নির্ধারণে ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় পর্যায়ে তিনটি কমিটি গঠিত হয়েছে। জাতীয় কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি পরিকল্পনার প্রাথমিক খসড়া ইতোমধ্যে জমা দেয়া হয়েছে অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে।
খসড়া পরিকল্পনা অনুসারে মোট চারটি পর্যায়ে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দেয়া হবে। বাকি ২০ শতাংশকে হার্ড ইমিউনিটির (গণরোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কারণে টিকা দেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। চার ধাপে এই ভ্যাকসিন দেয়া হবে বাংলাদেশের মানুষকে।
এর মধ্যে একেবারেই প্রথম পর্যায়ে রয়েছেন প্রায় ৫২ লাখ মানুষ, যেটা মোট জনসংখ্যার তিন শতাংশ। তার মধ্যে সবার আগে রয়েছেন দেশের সব সরকারি হাসপাতালে কর্মরত করোনা রোগীদের চিকিৎসাসহ সরাসরি সম্পৃক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। বর্তমানে দেশে স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এরপর রয়েছেন সব বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে (এনজিওসহ) কর্মরতরা। যার সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ।
তার পরের ধাপে আছেন সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নন-কোভিড সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও কর্মীরা। তাদের মধ্যে আছেন প্রায় এক লাখ ২০ হাজার প্রশাসনিক কর্মী, লন্ড্রি ও কিচেন কর্মী, অফিস সহায়ক, চালক ও অন্যরা। স্বাস্থ্যকর্মীদের পর প্রথম ধাপেই টিকার তালিকাতে আছেন দুই লাখ ১০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা, যারা বয়স্ক এবং যাদের অন্যান্য রোগের কারণে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে।
প্রথম ধাপের এই তালিকাতে রয়েছেন সম্মুখসারির কর্মীরা। তাদের মধ্যে আছেন পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, আনসার, ভিডিপির প্রায় পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৬১৯ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আনুমানিক প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্স, বিজিবি, র্যাব, কোস্টগার্ড, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট রয়েছেন।
মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ পাঁচ হাজার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, ৫০ হাজার সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী রয়েছেন। আরো আছেন এক লাখ ৭৮ হাজার ২৯৮ জন জনপ্রতিনিধি, সিটি করপোরেশনের প্রায় দেড় লাখ কর্মী এবং ইমাম, মুয়াজ্জিন, চার্চ, মন্দির, বৌদ্ধমন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ের ধর্মীয় পেশাজীবীরা রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ ৫ লাখ ৮৬ হাজার।
৭৫ হাজার দাফন ও সৎকারে যুক্ত কর্মী, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবহন ব্যবস্থায় জড়িত কর্মী, যাদের সংখ্যা রয়েছে প্রায় চার লাখ। এরপর আছেন প্রায় দেড় লাখ বন্দরকর্মী, এক লাখ ২০ হাজার প্রবাসী শ্রমিক (তারা কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশে ফিরে যাবেন)। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে এসে কাজ করতে হয় এমন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা (চার লাখ) এবং এক লাখ ৯৭ হাজার ৬২১ জন ব্যাংক কর্মী। এছাড়াও এই তালিকায় আরো রয়েছেন এইচআইভি, যক্ষ্মা, ক্যান্সারে আক্রান্ত, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং যাদের ঝুঁকি রয়েছে। তাদের সংখ্যা ছয় লাখ ২৫ হাজার। বাফার রিজার্ভ হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের জন্য জমা রাখা হবে প্রায় ৭৮ হাজার জনকে দেয়ার মতো টিকা।
এ প্রসঙ্গে করোনা বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ভ্যাকসিন আসার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এর সুষ্ঠু বিতরণ। সেটা নিয়েও আমাদের পরিকল্পনা হয়েছে। সেখানে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে কী কী মিস ম্যানেজমেন্ট হতে পারে সেগুলো যাতে না হয় তা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। তবে এটা কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়, এখানে স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন আর তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ রয়েছে। এই পরিকল্পনাগুলো ভালোভাবেই করা হচ্ছে বলে সূত্র জানায়।
খবর সারাবেলা / ০৩ জানুয়ারি ২০২১/এমএম




