করোনাকে ভুলতে বসেছে মানুষ
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক থাকলেও মানুষ একে ভয় পায় না। করোনা এখন যেন মামুলি ‘সর্দিজ্বর’। অনেকের মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। করোনা যে মহামারী- তা হয়তো অনেকে ভুলে যেতে বসেছেন। এ অবস্থায় করোনাকে গুরুত্ব না দেয়ায় টেস্টের প্রবণতাও কমেছে।
করোনা পরিস্থিতি শুরুর প্রথমদিকে যেভাবে মানুষ গুরুত্ব দিয়েছে এখন সেভাবে আর গুরুত্ব পাচ্ছে না। এছাড়া জীবিকার প্রয়োজনে মানুষকে কাজে বের হতে হচ্ছে। করোনা মহামারী হলেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে এটা কোনো রোগ নয়- শুধুই আতঙ্ক।
এদিকে করোনাকে গুরুত্ব না দেয়ার কারণে রাজধানীর করোনা ডেডিকেটেড (বিশেষায়িত) হাসপাতালে রোগী ভর্তির হার কমে গেছে। রোগী না থাকায় এরইমধ্যে ৫টি হাসপাতাল বন্ধ করা হয়েছে। তবে শীতের মৌসুমে করোনা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে কি না এ নিয়ে ঠিকই জনমনে রয়েছে সংশয় ও শঙ্কা।
রাজধানী গুলশান-বনানী থেকে শুরু করে জেলা শহর ও দেশের প্রত্যন্ত এলাকা- সর্বত্রই করোনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চলছে ‘নিউ নর্মাল লাইফ’। অনেকে বুক ব্যথা বা ফুসফুসে আক্রান্ত হলেই কেবল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। মামুলি ‘সর্দিজ্বর’ কিংবা করোনা পজেটিভ হলেও কেউ হাসপাতালে যেতে চান না। ফলে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোয় এখন রোগী নেই।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সারা দেশের করোনা চিকিৎসায় ১১ হাজার ৬৮৭টি সাধারণ শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি আছে মাত্র ২ হাজার ৪৬৫ জন। খালি পড়ে আছে ৯ হাজার ২২২টি শয্যা। আর ৫৬৪টি আইসিইউ শয্যায় রোগী ভর্তি আছে ২৫০ জন। খালি আছে ৩১৪টি শয্যা। রোগীশূন্যতায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে রাজধানীর ৫টি করোনা হাসপাতাল।
জানা গেছে, রাজধানীর ১৯টি করোনা হাসপাতালের ৩ হাজার ৫১৯টি সাধারণ শয্যায় রোগী ভর্তি আছে মাত্র ১ হাজার ৭৪৮ জন। খালি পড়ে আছে ১ হাজার ৭৭১টি শয্যা। আইসিইউ রয়েছে ৩১৪টি, রোগী ভর্তি আছে ১৫৮ জন। খালি আছে ১৫৬টি। আর চট্টগ্রামের ৯টি করোনা হাসপাতালের ৭৮২টি শয্যার মধ্যে ১২৮ জন রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ৬৫৪টি শয্যা। ৩৯টি আইসিইউ শয্যার ১৬টিতে রোগী আছে। খালি আছে ২৩টি শয্যা।
দেশের অন্যান্য হাসপাতালে আরো ৭ হাজার ৩৮৬টি শয্যায় মাত্র ৫৮৯ জন রোগী ভর্তি আছে। খালি পড়ে আছে ৬ হাজার ৭৯৭টি শয্যা। আর ২১১টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে মাত্র ৭৬টি শয্যায় রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ১৩৫টি শয্যা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, যে হারে মানুষ করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন সেই হারে রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন না। অধিকাংশ রোগীই বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা বলছেন, হাসপাতালের চেয়ে বাসায় চিকিৎসা নিতে সুবিধা। কারণ যারা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। হাসপাতালের নানা অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসক-নার্সদের অসৌজন্যমূলক আচরণ, দালালদের হয়রানি, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ওষুধের জন্য বাড়তি খরচের মতো ব্যাপার রয়েছে।
এছাড়া শ্বাসকষ্টের রোগীদের অক্সিজেন সাপোর্টের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সেন্ট্রাল অক্সিজেন দিয়ে সিরিয়াস রোগীদের বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়। কিছু কিছু হাসপাতালে প্রফেসর বা কনসালটেন্টের দেখা মেলে না। এসব হাসপাতালে জুনিয়র চিকিৎসক দিয়েই কার্যক্রম চালানো হয়।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা রয়েছে। সেজন্য অবশ্যই হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, রোগীরা বাসায় যে সুবিধা পায় হাসপাতালগুলো সেরকম সুবিধা দিতে পারে না। খাবার-দাবার থেকে শুরু করে, আলাদা থাকার ব্যবস্থা যদি থাকে আর রোগীর অবস্থা যদি খারাপ না হয় তাহলে তারা হাসপাতালে আসবে না। প্রান্তিক পর্যায়েও যারা আছে তারাও হাসপাতালে আসছে না।
তিনি বলেন, সরকারের দরকার প্রান্তিক লেভেলের ওই মানুষদেরকে হাসপাতালে নিয়ে আসা। মানুষ হাসপাতালে এলে সহায়তা পায় না। হাসপাতালে আসার পর নানা ইস্যুতে তাদের অনেক খরচ বেড়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধসহ নানা খরচ। রোগীর পেছনে অনেক দালালও লেগে যায়। বাসায় থাকলে এই খরচগুলো হয় না।
তাই রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে এলে খেয়াল রাখতে হবে তারা যেন হয়রানির শিকার না হয়। আর আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে রোগীকে হাসপাতালে না আনলে সে বাইরে থেকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে রোগ ছড়াবে। তার পরিবারের সদস্যরা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে যাচ্ছে। ফলে ওই রোগীর কাছ থেকে তার পরিবারের সদস্যরা রোগ বহন করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর করোনা বিশেষায়িত কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যার সংখ্যা ২০০টি। বর্তমানে রোগী ভর্তি আছে ৬৬টি শয্যায়। খালি আছে ১৩৪টি। আইসিইউতে শয্যা সংখ্যা ১৬টি। রোগী ভর্তি ১৩ জন। খালি আছে ৩টি। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সাধারণ শয্যা ২৭৫টি, রোগী ২২৯ জন। খালি আছে ৪৬টি। আইসিইউতে শয্যা আছে ১০টি। রোগীও ভর্তি ১০ জন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাধারণ শয্যা আছে ৮৮৩টি। রোগী ভর্তি ৫৬০জন। খালি আছে ৩২৩টি। ২৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি আছে ১৭ টিতে। খালি আছে ৮টি। মুগদা জেনারেল হাসপাতালে সাধারণ ৩২০টি শয্যার মধ্যে ১২৯ জন রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ১৯১টি। আইসিইউ ১৪টি শয্যার মধ্যে রোগী আছেন ১২টিতে। খালি আছে ২টি।
রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে সাধারণ ২৫০টি শয্যার মধ্যে ১৩১টিতে রোগী ভর্তি আছে। ১১৯টি শয্যা খালি আছে। ১৫টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৮টিতে রোগী ভর্তি। খালি আছে ৭টি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ২৩৪টি শয্যার ২০৪টিতে রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ৩০টি। আইসিইউর ১৬টি শয্যার ১৩টিতে রোগী ভর্তি রয়েছেন। খালি আছে ৩টি। মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সাধারণ ১০টি শয্যার ১০টিই খালি।
শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের সাধারণ ১৪০টি করোনা শয্যার ৩৪টিতে রোগী ভর্তি আছে। ১০৬টি শয্যা খালি। ১৬টি আইসিইউ শয্যার ৫টিতে রোগী ভর্তি। খালি আছে ১১টি।
বেসরকারি আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ২০০টি করোনা শয্যার মধ্যে ৪০টি শয্যায় রোগী ভর্তি আছে। ১৬০টি শয্যা খালি। আইসিইউ ১০টি শয্যার মধ্যে ৭টিতে রোগী আছে। খালি আছে ৩টি। সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সাধারণ ৬৬টি শয্যার মধ্যে ৩৬টিতে রোগী আছে। ৩০টি শয্যা খালি। আইসিইউর ৬টি শয্যার মধ্যে ১টিতে রোগী ভর্তি। খালি আছে ৫টি।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ১৫০টি করোনা শয্যার মধ্যে ৭৯টিতে রোগী আছে। ৭১টি শয্যা খালি। আসগর আলী হাসপাতালের সাধারণ ১৬৮টি শয্যার মধ্যে ২৯ জন রোগী ভর্তি আছে। ১৩৯টি শয্যা খালি। ৩৬টি আইসিইউ শয্যার ১৫টিতে রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ২১টি।
স্কয়ার হাসপাতালের সাধারণ ৭৪টি শয্যার মধ্যে ৪৯টিতে রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ২৫টি। ২৫টি আইসিইউ শয্যার ১১টিতে রোগী ভর্তি আছে। ১৪টি শয্যা খালি। ইবনে সিনা হাসপাতালের ৩৬টি সাধারণ শয্যার ২৭টিতে রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ৯টি। আইসিইউরর ৬টি শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি আছেন ৫টিতে। খালি রয়েছে ১টি।
ইউনাইটেড হাসপাতালের সাধারণ ৫৯টি করোনা শয্যার ২৪টিতে রোগী আছে। খালি আছে ৩৫টি। আইসিইউ ২২টি শয্যার ৫ টিতে রোগী। খালি আছে ১৭টি। এভার কেয়ার হাসপাতালের সাধারণ ২৮টি শয্যার মধ্য ১৯টিতে রোগী ভর্তি আছে। খালি আছে ৯টি। আইসিইউর ২০টি শয্যার ১৪টিতে রোগী আছে। খালি আছে ৬টি আইসিইউ শয্যা।
ইম্পালস হাসপাতালের সাধারণ ৩৪৪টি করোনা শয্যার ২৬টিতে রোগী আছে। খালি আছে ৩১৮টি। ৫৬টি আইসিইউ শয্যার ৪টিতে রোগী ভর্তি আছে। ৫২টি আইসিইউ শয্যা খালি।
এ এম জেড হাসপাতালে ৫২টি শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি আছে ৩৬টিতে। খালি রয়েছেন ১৬টি। ১০ টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে রোগী ভর্তি আছেন ৬টিতে। খালি রয়েছে ৪টি। আর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৩০টি সাধারণ শয্যার সবকটিতে রোগী ভর্তি আছে। আইসিইউর ১২টি শয্যারও সবক’টিতে রোগী আছে।
খবর সারাবেলা / ১১ অক্টোবর ২০২০ / এমএম




