একাধিকবার করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে বাংলাদেশিরা
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ওঠার সংখ্যা নেহাত কম নয়। এই করোনাজয়ীদের ঝুঁকিও কমছে। কারণ, তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি (রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা) তৈরি হচ্ছে। কিন্তু দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার পরেও বাংলাদেশে তিনবারও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ডা. দাস নামে একজনের চিকিৎসক তিনবার আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
চিকিৎসকরা বলেছেন, তিনবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ঘটনা বিরল কিন্তু ঘটছে। সাধারণত করোনায় আক্রান্ত হলে সুস্থ হওয়ার পরের ছয় মাসে আর ওই ভাইরাসটি কাউকে সংক্রমিত করতে পারে না। কারণ আক্রান্তের দেহে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তা ছয় মাস পর্যন্ত থাকে। কিন্তু ওই বাংলাদেশি ডাক্তার দাসের ব্যাপারে তত্ত্বটির প্রতিফলন ঘটেনি।
গত ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত এ বিষয়ক বড় পরিসরের একটি ব্রিটিশ গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রথমবার আক্রান্তের পর ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে আবার কেউ আক্রান্ত হতে পারেন। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে বয়স্করাই বেশি আক্রান্ত হতে পারেন কারণ তাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) কম থাকে। করোনায় আক্রান্ত হলে সুস্থ হওয়ার জন্য তাদের দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় ঠিকই তাদের দেহে অ্যান্টিবডি খুব বেশি দিন টিকে না। তাদের মেমরি সেল দুর্বলও হয়ে যায়।
বাংলাদেশের ডা. দাস নামের যে চিকিৎসকের তিনবার করোনা হয়েছে। তিনি করোনা চিকিৎসাতেই যুক্ত ছিলেন। সরকারের কারিগরি পরামর্শ কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন ডা. দাসের দেহে হয়তো করোনাভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গিয়েছিল। সে কারণে তিনি প্রথমবার আক্রান্তের পর আরও দু’বার আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি গত এপ্রিল, জুলাই ও সর্বশেষ চলতি অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তৃতীয়বারের মতো আক্রান্ত হয়েছেন।
ডা. দাসের তৃতীয়বার আক্রান্তের বিষয়ে রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর বলেন, প্রথম সংক্রমণের ছয় মাসের মধ্যে জীবাণু শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে।
তবে চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথের উপ-প্রধান ড. পেং ইয়ো চীনের ইংরেজি দৈনিক গ্লোবাল টাইমসকে ডা. দাসের তৃতীয় সংক্রমণের বিষয়ে বলেন, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে গড়ে ওঠা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে থাকতে পারে। ফলে তিনি দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হতে পারেন।
ড. পং এ ব্যাপারে আরো বলেন, এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল। দেহে অ্যান্টিবডি দুর্বল হয়ে গেলে এমনটা হতে থাকতে পারে। ফলে এ ধরনের মানুষ তৃতীয়বারও আক্রান্ত হতে পারেন। এর অন্য কারণ হতে পারে ভাইরাসটি শরীরে থেকেই শক্তিশালী নতুন কোনো স্ট্রেইনে রূপান্তর হয়ে যেতে পারে অথবা তার দেহে তৈরি অ্যান্টিবডি এমন দুর্বল ছিল যে দ্বিতীয় সংক্রমণের সময় তা বাধা দিতে পারেনি।
তিনি বলেন, চীনে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। তবে ব্রিটেনের মেইল অনলাইন তার রিপোর্টে বলেছে, চীনে ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দ্বিতীয়বার আক্রান্ত যেসব কেস পাওয়া গেছে এগুলো ফলস পজিটিভ বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং এসব হয়েছে দেহে থাকা মৃত ভাইরাসের পার্টিকলের (ভাইরাসের অংশ) কারণে। পিসিআর মেশিন খুব সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করে থাকে। এ মেশিন ভাইরাসের ক্ষুদ্রাংশ পেলেও তা পরীক্ষায় পজিটিভ হিসেবে ধরে থাকে।
মেইল অনলাইনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি যে চিকিৎসক তিনবার আক্রান্ত হয়েছেন তিনি মৃত ভাইরাস পার্টিকলের কারণে ফলস পজিটিভ হয়ে থাকতে পারেন।
তবে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মেডিক্যাল স্টাফ কমিটির চেয়ারপারসন এবং ইউনিভার্সিটি অব অ্যাক্সেটারের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল লেকচারার এ বিষয়ে বলেন, এটা এমনও হতে পারে যে ডা: দাস তার রোগীর কাছ থেকেই নতুন করে ভাইরাসে সংক্রমণের শিকার হতে পারেন। এটা এমনও হতে পারে যে, তার দেহে কমসংখ্যক ভাইরাস থাকায় তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার আক্রান্ত হয়েছেন।
করোনায় পঞ্চাশোর্ধ্বদের মৃত্যুর হার ৭৮ শতাংশ : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৫ জন। তার মধ্যে ১১ জনের বয়সই ৬০-এর ঊর্ধ্বে। শতকরা হিসাবে গতকাল করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তির হার ৪৪ শতাংশ। কিন্তু সার্বিক হিসাবে এ পর্যন্ত দেশে করোনায় যত মানুষ মারা গেছেন তাদের মধ্যে ৫২ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশই ৬০ বছরের অধিক বয়সী লোকজন।
সংখ্যার হিসেবে দেখতে গেলে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে করোনায় মারা গেছেন পাঁচ হাজার ৮৮৬ জন। সেখানে তিন হাজার ৬৪ জনই ষাটোর্ধ্ব বয়সী। অন্য দিকে ৫১-৬০ বছর বয়সী করোনা রোগী মারা গেছেন এক হাজার ৫৫৮ জন। শতকরা হিসেবে যা ষাটোর্ধ্বদের অর্ধেক, ২৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৫১-৬০ এবং ৬০+ এ দু’টি শ্রেণীতে মোট মারা গেছেন চার হাজার ৬২২ জন। শতকরা হিসেবে যা করোনার মোট মৃত্যুর ৭৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
এ দিকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ২৫ জনসহ এ পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন পাঁচ হাজার ৮৮৬ জন। এ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ৬৮১ জন। এখন পর্যন্ত মোট শনাক্তের সংখ্যা চার লাখ চার হাজার ৭৬০ জন। এই সময়ে সুস্থ হয়েছেন এক হাজার ৫৪৮ জন। এখন পর্যন্ত মোট সুস্থ হলেন তিনি লাখ ২১ হাজার ২৮১ জন।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা: নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত করোনা বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ আর এখন পর্যন্ত শনাক্তে হার ১৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৭৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ আর শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার এক দশমিক ৪৫ শতাংশ।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে পুরুষ ১৬ জন আর নারী ৯ জন। এখন পর্যন্ত চার হাজার ৫২৯ জন পুরুষ এবং এক হাজার ৩৫৭ জন নারী মারা গেছেন। শতকরা হিসেবে পুরুষ ৭৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ আর নারী ২৩ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ।
বয়স বিবেচনায় দেখা গেছে, মারা যাওয়াদের মধ্যে ২১-৩০ বছরের মধ্যে দুইজন, ৪১-৫০ বছরের মধ্যে তিনজন, ৫১-৬০ বছরের মধ্যে ৯ জন এবং ষাটোর্ধ্ব বয়সী রয়েছেন ১১ জন। মৃত ২৫ জনের মধ্যে হাসপাতালে মারা গেছেন ২৪ জন আর বাড়িতে মারা গেছেন একজন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভাগভিত্তিক মৃত্যু বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন ১৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচজন, সিলেট বিভাগে তিনজন আর বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে মারা গেছেন একজন করে দুইজন।
খবর সারাবেলা / ৩০ অক্টোবর ২০২০ / এমএম




